সোয়েব সাঈদ:
আশপাশের অন্তত ৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নেই কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে এলাকার শিশুরা ঝরে পড়তো শিক্ষা জীবন থেকে। শিক্ষার্থীদের এমন দূর্ভোগের বিষয়টি অবশেষে অনুভব করলো গ্রামবাসী। আর এ কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে শুরু করেছে একটি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ কাজ।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনীয়া ইউনিয়নের থোয়াংগেরকাটা এলাকায় গর্জনীয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতন এর ভবন নির্মাণে এলাকাবাসীর ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগটি জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল জব্বার জানিয়েছেন, রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের থোয়াংগেরকাটাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম অতিদূর্গম ও চির অবহেলিত জনপদ হিসেবে পরিচিত। এমনিতে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ গ্রামের আশপাশে নেই কোন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে এ গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর অধিকাংশই ঝরে পড়ে। আর কোন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করলে তাকে প্রতিদিন আসা-যাওয়ার জন্য প্রায় ৮/১০ কিলোমিটারের বেশি পথ হাটতে হয়।
এমন দূর্দশা লাঘবে ২০০৩ সালে এ গ্রামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে গর্জনীয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতন নামের মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওই সময় এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি আবদুল আলীম ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিদ্যালয়ের জন্য ১ একর দশ শতক জমিও ক্রয় করেন। কিন্তু অর্থ সংকট, নিজস্ব/স্থায়ী ভবন না থাকা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কয়েক বছর স্থবির হয়ে পড়ে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়টিকে গতিশীল করতে এগিয়ে আসে এলাকার সর্বস্তুরের জনসাধারণ। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করে। কেবল শারীরিক শ্রম দেয়া নয়, অনেক দিয়েছেন ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত গাছ, টিন, বাঁশসহ নানা সরঞ্জাম। এলাকার বিত্তশালী আর প্রবাসীরা দিয়েছেন নগদ অর্থ সহায়তা।
গত শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণকাজে অংশ নিচ্ছেন প্রায় দুই শতাধিক। কেউ খুড়ছেন মাটি। কেউ আবার মাটি ভরাট করা, কাঠের খুটি স্থাপনে ব্যস্ত। এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে দেখভাল করছেন কাজের অগ্রগতি। নির্মাণকাজ চলাকালে ৮০ বছরের বেশী বয়স্ক অনেক ব্যক্তিকেও হাতে খুন্তি, দা, কুড়াল নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাজাহান আলিিআমাদের রামু কে বলেন, স্বেচ্ছাশ্রমে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে এলাকাবাসীর এ ধরনের উদ্যোগ নেয়াটা প্রশংসনীয়।
বিদ্যালয়ের জমি দাতা বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী আবদুল আলীম জানিয়েছেন, এলাকার সর্বস্তুরের মানুষ এ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে এ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে। নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ভবনটি নির্মাণ হলে থোয়াংগেরকাটা সহ আশপাশের ১০টিরও বেশি গ্রামের শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম ও ইয়াছমিন আকতার জানিয়েছেন, অতীতে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন না থাকায় পার্শ্ববর্তী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হতো। ওই বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছিলো না। এখন নিজস্ব ভবন নির্মাণ হওয়ায় পাঠদান নির্বিঘ্ন হবে।
গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল জব্বার জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে এলাকার সর্বস্তুরের মানুষের পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কক্সবাজার-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, রামু উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, গর্জনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
এছাড়া গত শুক্রবার (২ডিসেম্বর) বিদ্যালয় ভবন নির্মাণকাজ উদ্বোধনকালে এলাকার সচেতন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক জয়নাল আবেদিন, গর্জনীয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতন এর জমি দাতা বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী আবদুল আলীম, রামু রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি সোয়েব সাঈদ, গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আওয়ামীলীগ নেতা আবদুল জব্বার, থোয়াংগেরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল, মাস্টার আবু নাসের, সাবেক মেম্বার রফিক আহমদ ও আবু তাহের, আওয়ামীলীগ নেতা নুরুল আমিন, মো. আলম সওদাগর, আবদুল্লাহ, হামিদুল হক, জাহাঙ্গীর আলম, মো. হারুন, তৌহিদুল ইসলাম, আওয়ামীলীগ নেতা আবুল কাশেম, মৌলভী আবু বক্কর, আবু ছৈয়দ, শফিউল আলম, আবদুল হামিদ, নুরুল আজিম, আইয়ুব, মো. বেলাল, মুফিদুল আলম, আবদুল আজিজ, জয়নাল আবেদিনসহ শত শত জনতা উপস্থিত হয়ে নির্মাণ কাজে শরিক হন।
থোয়াংগেরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল জানিয়েছেন, অবহেলিত জনপদে এলাকাবাসীর এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এলাকাবাসী শিক্ষার জন্য এভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভবিষ্যতে এ এলাকাটি সমৃদ্ধ জনপদে রূপ নেবে।







