নিজস্ব প্রতিবেদক:
২৯ ডিসেম্বর বৃহষ্পতিবার। পরদিন শুক্রবার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত বেলাল আহমদ। রাত ৯টা বাজতেই ফোন দিলেন চেয়ারম্যান মোস্তাক। ‘কাল মেয়ের বিয়ে দিতে হলে তাকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে। এরমধ্যে ১০ হাজার টাকা ইউএনও এবং ৫ হাজার টাকা ওসি’কে দিতে হবে। কাল (বিয়ের দিন) সকাল আটটার মধ্যে এ টাকা না দিলে বিয়ে হতে পারবে না” এভাবে দরিদ্র কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার কাছ থেকে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে টাকা আদায়ের একটি অডিও রেকর্ড নিয়ে পুরো রামুজুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
এ রেকর্ডে বেলাল আহমদের কাছ থেকে মেয়ের জন্মনিবন্ধন দিয়ে ৩ হাজার টাকা নেয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন চেয়ারম্যান মোস্তাক। ইতিমধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে মেয়ের বাবা ও চেয়ারম্যানের এ অডিও রেকর্ড।
ইউনিয়নের ক্ষুব্দ জনতা ও ভুক্তভোগীরা জানালেন, রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদের অনিয়ম-দূর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ৪০ হাজার মানুষ। এভাবে দিনরাত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে অর্থ হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিতর্কিত এ ইউপি চেয়ারম্যান। ইতিপূর্বে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা টিলাপাড়া এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় কাটা নিয়ে ব্যাপক আলোচিত হন ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্বপাড়ার বেলাল আহমদ জানিয়েছেন, গত শুক্রবার তার মেয়ে আচ্ছফা ছিদ্দিকার সাথে কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালি এলাকার মৃত আকতার কামালের ছেলে তাজুল ইসলামের বিয়ের দিন ছিলো। আগের দিন (বৃহষ্পতিবার) রাতে চেয়ারম্যান তাকে ফোন করে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। এমনকি টাকা না দিলে বিয়ে হবে না মর্মে হুমকীও দেন। এসময় তিনি আর্থিক সমস্যার কারনে টাকা দেরিতে দেয়ার অনুরোধ জানালে চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং বিয়ের দিন সকাল আটটার মধ্যে টাকা দিতে নির্দেশ দেন। এসময় বেলাল আহমদ অতিথিদের দেয়া টাকা নিয়ে তাকে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে আরো কিছুক্ষণ সময় চান। কিন্তু ততক্ষণে চেয়ারম্যানের টাকা চাওয়ার বিষয়টি পুরো বিয়ে বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি টের পেয়ে চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ দুপুরের আগেই বিয়ে বাড়ি ত্যাগ করেন।
বেলাল আহমদ আরো জানান, ইতিপূর্বে মেয়ে আচ্ছফা ছিদ্দিকার জন্মনিবন্ধন দেয়ার জন্য চেয়ারম্যান ৩ হাজার টাকা নেন।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আজিজুল হক জানিয়েছেন, বেলাল আহমদের মেয়ের বয়স এখনো বিয়ের উপযুক্ত হয়নি। কিন্তু চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ সম্প্রতি বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন দেন। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউএনও, ওসি’র নাম ভাঙ্গিয়ে চেয়ারম্যান কন্যাদায়গ্রস্ত এক বাবার কাছ থেকে এভাবে অর্থ দাবি করেছে। এটি নিয়ে পুরো এলাকা এখন আলোচনা-সমালোচনায় মুখর।
একই ইউনিয়নের বাসিন্দা সার ডিলার নাজির হোসাইন জানিয়েছেন, সম্প্রতি তিনি ছেলের জন্য জন্মনিবন্ধন নিতে গেলে চেয়ারম্যান তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেন। এমনকি তিনি টাকা দিতে অপরাগতা জানালে চেয়ারম্যান তার সাথে তর্কেও জড়ান।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে চেয়ারম্যান মোস্তাক জাতীয়তা সনদ, ওয়ারিশ সনদ, ভূমিহীন সনদ, প্রত্যয়নসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবামূলক কাজে মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করে লোকজনকে হয়রানি করে আসছে। এর ফলে এলাকায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
রামু উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হক জানিয়েছেন, ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ বিচারের নামেও এলাকার লোকজনের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিচ্ছেন। সম্প্রতি এমন অনেক ঘটনা এখন লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি কখনো সংসদ সদস্য, কখনো উপজেলা চেয়ারম্যান এবং কখনো উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামে চাঁদা দাবি, হুমকি-ধমকি সহ নানাভাবে মানুষকে হয়রানি করে আসছেন।
তবে ওই চেয়ারম্যান, তার অডিও রেকর্ড প্রচার হওয়ার পরও এটা তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন।
এই বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাজাহান আলি আমাদের রামু কে বলেন, চেয়ারম্যানের প্রচার হওয়া গোপন অডিও রেকর্ডিং আমিও শুনেছি। যা শুনলাম তা খুব আপত্তিকর।এই বিষয়ে কেউ যদি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাহলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






