আমাদের রামু প্রতিবেদক:
ছাত্রী ধর্ষনসহ নানা কেলেংকারিতে অভিযুক্ত রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বহুল বিতর্কিত প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ করিম বরখাস্ত হওয়ার পরও এখনো দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। উল্টো আজ সোমবার (১৬ জানুয়ারী) সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস চলাকালীন সময়ে ছাত্রীদের শ্রেণী কক্ষ থেকে রাস্তায় বের করে তাঁর পক্ষে মানববন্ধনে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে বিতর্কিত এ প্রধান শিক্ষক। এ ঘটনায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দু’পক্ষের মধ্যে হট্টগোল দেখা দিলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রথম ঘন্টার পরে এ বিদ্যালয়ে কোন ক্লাস হয়নি।
রামু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল বলেন, নৈতিক স্খলন,বিদ্যালয়ের অফিস সহকারীকে শারীরিক নির্যাতন, শিক্ষক-কর্মচারিদের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি ও শৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ড এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার (১৫ জানুয়ারি) সৈয়দ করিমকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা কমিটি। সেই সাথে তাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীনকে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল সোমবার সকালে তিনি বিদ্যালয়ে এসে ক্লাস চলাকালীন সময়ে জোর করে ছাত্রীদের রাস্তায় বের করে তার পক্ষে মানববন্ধনে দাঁড়াতে বাধ্য করে। যা নিয়ম বহির্ভুত।
তিনি বলেন,দীর্ঘদিন ধরে এ প্রধান হোস্টেলের ছাত্রীদের প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ,কখনো বাবা-মা ফোন করেছে বলে রাতে অফিস কক্ষে ডেকে এনে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিভিন্ন ছাত্রী ছাড়াও এক হোস্টেল সুপারের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তার কাছে যৌন হয়রানির শিকার এ রকম চারজন শিক্ষার্থীর্ আমার কাছে লিখিত অভিযোগও করেছে। বিদ্যালয়টির ভাবমুর্তি রক্ষার স্বার্থে তাকে বহিস্কারের সিদ্বান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, সোমবার সকালে তিনি যথারীতি স্কুলে আসেন। এর কিছুক্ষণ পরে ছাত্রলীগের ছেলে-পেলেসহ কিছু বহিরাগত লোক নিয়ে তিনি বিদ্যালয়ে আসেন। এরপরে দ্বিতীয় ক্লাস শুরু হলে তিনি ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে ছাত্রীদের মানববন্ধনে অংশ নিতে রাস্তায় বের হতে বলেন। মানববন্ধনের নামে প্রায় আধাঘন্টা ছাত্রীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে হট্টগোল তৈরী হলে আর কোন ক্লাস চলেনি।
তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে সৈয়দ করিম বলেন,গত বছরের ২৩ জুলাই এ কমিটির মেয়াদউত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে। কিছুই না করে হোটেল মীম-এ বসে বিদ্যালয়ের মিটিং করে এ আমাকে বহিস্কার করেছে। জোর করে ছাত্রীদের মানববন্ধনে নেওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করে তিনি বলেন-ছাত্রীরা আমার কাছ থেকে ১০ মিনিটের জন্য অনুমতি নিয়ে মানববন্ধনে গেছে। জোর করে বের করার প্রশ্নই আসেনা। নানা প্রলোভনে ছাত্রীদের যৌন হয়রারির বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন।
নাম প্রকাশে অনিশ্চুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগ তো আছেই,কিন্তু হোস্টেল সুপার ও ছাত্রীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর বিষয়টি এখন ছাত্রী,শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মুখে মুখে। এ বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট । কিন্তু রহস্য জনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিকল্প কোন নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় বাধ্য হয়ে ওই বিদ্যালয়েই পড়াতে হচ্ছে। যে কারণে উৎকন্ঠায় থাকতে হতো অভিভাবকদের। দীর্ঘদিন পরে হলেও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির এ সিদ্বান্তে অভিভাবকদের মাঝে কিছুটা স্বস্থি ফিরেছে।

বিদ্যালয় সুত্রে জানা গেছে,নারী কেলেংকারিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সম্প্রতি অভিযোগ দেন রামুর সচেতন জনতা । এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৪ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম এর আঞ্চলিক উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আজিজ উদ্দিন বিদ্যালয়ে এসে এসব অভিযোগের তদন্ত করেন।
মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৬ সালে বিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকা এক ছাত্রীকে ধর্ষন করেন প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ করিম। ওই ঘটনায় ধর্ষিতার অভিভাবক বাদি হয়ে রামু থানায় মামলা (জি আর ৫৭/০৬) করেন। এ মামলায় পুলিশ ছৈয়দ করিমকে গ্রেফতার করে। পরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সৈয়দ করিমকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত এবং পরে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার সিদ্বান্ত নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ধর্ষনের শিকার ছাত্রীর পরিবারকে ম্যানেজ করে ওই মামলাটি নিষ্পত্তি করে,নানা কৌশলে ছৈয়দ করিম পূনরায় বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। কিন্ত গত বছর-দুয়েক সময় থেকে ছৈয়দ করিম আবার বিদ্যালয়ের এক হোস্টেল সুপার এবং একাধিক ছাত্রীর সাথে অনৈতিক সর্ম্পকে জড়িয়ে ফের আলোচনায় চলে আসেন।
অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যালয়ের আভ্যন্তরিন পরীক্ষার প্রশ্ন নির্ধারিত সময়ের পূর্বে খুলে তার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক আছে এমন শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করতেন। ইতিপূর্বে এমন অভিযোগে তাকে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেয়া হয়েছিলো।
এমনকি বিতর্কিত এ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে রামুতে প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন এবং একাধিকবার পোষ্টার সাঁটিয়ে প্রতিবাদি প্রচারনা চালানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এ বিদ্যালয়ে সৈয়দ করিমকে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। যোগদানের দুই বছর না হতে ছাত্রী নিবাসে থাকা দশম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে ধর্ষনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়। ২০০৬ সালের ৫ এপ্রিল অফিস কক্ষ থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়।
এ ঘটনায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ২০০৮ সালের ৫ মে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় ছৈয়দ করিমকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিতকির্ত এ প্রধান শিক্ষককে পুণরায় নিয়োগ দেয় বিদ্যালয়ের তৎকালীন এডহক কমিটি।







