রুবেল বড়ুয়া:
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক গৌরব ময় ও ঐতিহ্যবাহী দিন। বাংলায় জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস হচ্ছে এই দিনটি। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহাসিক দিন এটি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির রক্ত ঝরা এ দিনটিকে স্বরণীয় করে রাখতে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ,সম্মান জানিয়েছে ভাষা শহীদদের প্রতি। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু আমাদের মাতৃ ভাষা দিবস না ; প্রতি বছর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ পালিত হচ্ছে ” আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস ” হিসেবে।
একুশের আদিকথা:
পাকিস্থান সৃষ্ঠির অব্যবহিত পূর্বে আলীগড়মুসলিম বিশ্ব বিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পূর্ব বঙ্গ থেকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি জানান(১১-ই শ্রাবন,১৩৫৪ বঙ্গাব্দ)। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। মূলত দ্বি-জাতি তত্তের উপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্থান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। পূর্ব বাংলায় মসুলমানরা ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ। তাই পূর্ব বাংলাকে পাকিস্থানের অন্তরভুক্তি করা হয়। পাকিস্থান সৃষ্টির পর থেকে পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্থান অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষা,শিল্প,সংস্কৃতি ধ্বংস করার চেষ্টা চালায় যার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় ভাষা আন্দোলন। পাকিস্থানের নব্য উপনিবেশবাদী,ক্ষমতালোভী , উদ্ধত শাসকরা শুরু থেকেই এদেশের মানুষের উপর নির্ানের স্টিম রোলার চালাতে থাকে। প্রথমেই তারা ফন্দি আঁটে কিভাবে এদেশের মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়া যায়। পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠী পাকিস্থানের এক মাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু কে গ্রহণ করতে সচেষ্ট হন ; যদিও বাস্তবে উর্দু ভাষাভাষী লোকের অনুপাত ছিল অনেক কম |
তালিকা:
বাংলা— ৫৪.৬%
পাঞ্জাবি–২৭.১%
পশতু—৬.১%
উর্দু—— ৬%
সিন্ধি — ৪.৮%
ইংরেজি — ১.৪%
সূত্র : বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়ন, লেখক: ড. আব্দুল ওয়াদুদ ভুইয়া,পৃষ্ঠা। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারত বিভাগের ১৯ তম দিনে “
তমুদ্দন মজলিস ” গঠন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে সংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেন। ঐ বছরের ১৫ই সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে “পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু ” শিরোনামে এই সংগঠনের উদ্যোগে ঘোষণা পত্র-পুস্তিকা প্রকাশ করা হয় —যা ভাষা আন্দোলনের ঘোষণা পরত নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমী মূলত রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিকে আন্দোলনে রূপ দেয়ার প্রথম উদ্যোক্তা। তার উদ্যোগেই তমুদ্দন মজলিস নামের সাংস্কৃতিক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার সাথে ছিলেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল হক ভুইয়া , সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও শাসুল আলম।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে করাচিতে এক কেন্দ্রীয়পর্জায়ের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় | সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পূর্ব বাংলা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রচন্ড প্রতিবাদ করে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারী মাসে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ঢাকায় সর্ব প্রথম রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং কতিপয় দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নীতি গঠিত হয়।
১. বাংলা ভাষা হবে পূর্ব বাংলার একমাত্র শিক্ষার বহন এবং অফিস -আদালতের প্রধান মাধ্যম।
২. পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা হবে দুইটি -বাংলা ও উর্দু।
ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় :
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান গণ পরিষদের প্রথন অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য গণ বিশেষত কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি জানান ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এ নীতির বিরোধিতা করে বলেন “(the more) should realize that Pakistan has been created because of the demand of one hundred million Muslims in the subcontinent and the language of a hundred million Muslims is Urdu”
উৎস : Constituent Assembly of Pakistan Debates,vol-2
লিয়াকত আলী খানের এই উক্তির ফলে ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহলে চরম অসন্তোষ দেখা দেয় এবং ২৬ ফেব্রুয়ারী সর্বত্র ধর্মঘট পালিত হয়। অবশেষে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলা ভাষার দাবি সমর্থনের আশ্বাস দিলে আন্দোলন প্রশমিত হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার প্রথম পূর্ব পাকিস্থান সফরে এসে ঢাকার রমনা রেসকোর্সে এক জনসভায় ঘোষণা করেন ” উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ” (Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan) তিন দিন পরে কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে তিনি যখন একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন,তখন উপস্থিত ছাত্ররা না না না ……. বলে এর প্রতিবাদ জানায়। ১৯৫০ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং ১৯৫২ সালের ৯ জানুয়ারী খাজা নাজিমুদ্দিন পুনরায় একই ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। ফলে ছাত্র-বুদ্ধিজীবী মহলে দারুন ক্ষোভ ও হতাশা তৈরী হয় এবং আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের অংশ হিসাবে ৩০ জানুয়ারী ঢাকায় সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলনকে তীব্রতর করার লক্ষে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারী এক জনসভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম গঠিত হয়। বঙ্গীয় সমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে বাঙালির আত্ম-অম্বেষায় যে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে, তারই সূত্র ধরে বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে।
ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত , আবদুল জব্বার ,আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্রযুবক হতাহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুণরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মাঝে এ চেতনার উন্মেষ হয়েছিল, তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে উনসত্তর থেকে একাত্তরে। একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য শহীদ দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নাই,তা বাঙালি জাতীয় জীবনে সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন নিয়ে বাঙালি জাতি সর্বপ্রথম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে উদ্ভুদ্ধ হয়েই বাঙালি জাতি পরবর্তিতে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়।
১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে,১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে প্রেরণা যুগিয়েছে ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাস। একুশ আমাদের স্বাধিকার চেতনার ভিত্তিমূল, একুশ-ই বাঙালি স্বাধীনতার প্রথম স্পর্শ। সেদিন তাঁরা স্বাধিকারের যে চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন, তারই স্রোতধারায় বাঙালি জাতি ১৯৭১- এ ঝাঁপিয়ে পরেছিল মুক্তিযুদ্ধে। সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে বিজয়ের মাধ্যমে আমরা লাভ করি স্বাধীন মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
বাঙালি জাতি একুশের মাধ্যমে প্রমাণিত করেছে যে, তাঁরা সংগ্রামী চিত্তের অধিকারী। রক্ত দিয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করতে সক্ষম। শুধু একুশ হচ্ছে সংগ্রামের প্রেরণা মাত্র। পরিশেষে বলতে চাই, ভাষা দিবস চিরকাল অমর থাকুক অন্তরে লালন করুক আগামী প্রজন্ম।






