আসুন প্রথমেই দেখি বিদায় হজ্বে এই বিষয়ে মহানবী সা: কি বলেছেন-
বিদায় হজ্ব :
দশম হিজরীর যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখে আরাফাত ময়দানে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এক লক্ষ চৌদ্দ হাজার সাহাবীর সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষন দেন। আসুন দেখি ঐতিহাসিক এই ভাষনে মহানবী অমুসলিমদের সম্পর্কে কি বলেছেন :-
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বলেন,
“হে বন্ধুগন, স্মরণ রেখো, আজকের এই দিনে (জুম্মার দিন) এ মাসে এবং পবিত্র মক্কা নগরী- তোমাদের নিকট যেমনি পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের সকলের জীবন, তেমাদের ধন সম্পদ, তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের মান মর্যাদা – তোমাদের পরস্পরের নিকট। তোমরা যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন অন্যের উপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করবে না।”
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কারো প্রতি জুলুম নির্যাতনও অন্যের সম্পদ লুন্ঠন না করার উদ্দেশ্যে বলেন,
“তোমরা কারো প্রতি জুলুম করবে না। এটা তোমাদের জন্য কখনও বৈধ নয় যে, অনুমতি ব্যতিরকে একে অন্যের সম্পদ গ্রহন করা।”
জাতি ও বর্ণ বৈষম্য না করার উদ্দেশ্যে বলেন,
“হে লোক সকল, মনে রেখো, কোনো অনারবের উপর আরবের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গদের কোনো প্রাধান্য নাই। “
ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ করে বলেন,
“সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। এই বাড়াবাড়ির কারনে তোমাদের পূর্বের বহু জাতি ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। “
রক্তপাত নিষিদ্ধ করে বলেন,
” তোমরা ঝগড়া ও রক্তপাতে লিপ্ত হইও না। “
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে বলেন,
“হে লোক সকল, মনে রেখো যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। সমাজে অন্যদের প্রতি সে রকম আচরন করবে যে রকম আচরন তোমরা নিজেরাও কামনা করে থাকো। “
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার সেবা করার জন্য বলেন,
“তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ , যে মানুষের উপকার করে। “
মানবতার ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে বলেন,
“মানব জীবন ও সামাজিক মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করে, কোনো অবস্থাতেই দুর্বল ও অসহায়দের উপর নির্যাতন করবে না। “
এবার দেখেন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে অমুসলিমদের নিরাপত্তার বিষয়ে হাদিসে কি আছে:
“যে মুসলিম ব্যক্তি মুসলমান রাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাত তো দুরে থাক তার সুগন্ধও পাবেনা যদিও জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ বছর সমপরিমাণ দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়”।
সহীহ বূখারী সংখ্যা-৩,হাদিস নং-২৯৯৫।
মানুষ হত্যার বিষয়ে এক হাদিসে আছে-
“দুনিয়া ধ্বংসের চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্যতম কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।” (তিরমিজি শরিফ)
“মনে রেখো, যদি কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিম নাগরিকের উপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার কোন বস্তু জোর পুর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষে মামলা দায়ের করবো।” –আর দাউদ শরীফ হাদিস নং ৩০৫২।
এমনকি যুদ্ধের সময়েও অমুসলিমদের কোনো উপসনালয়ে হামলা করা যাবে না এই সংক্রান্তে হযরত মোহাম্মদ (সা:) যুদ্ধে রওয়ানা করার সময় বলেন,
আমি তোমাদের কতগুলো উপদেশ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করছি :
তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, ভীরুতা দেখাবে না, কারো চেহারায় বিঁকৃতি ঘটাবে না, কোনো শিশুকে হত্যা করবে না, কোনো গির্জা জ্বালিয়ে দেবে না এবং কোনো বৃক্ষ উৎপাটন করবে না।” (আবদুর রাযযাক, মুসান্নাফ: 9430)
এই সংক্রান্তে আরেক হাদিসে আছে,
“যুদ্ধকালীন তোমরা গির্জার অধিবাসীদের হত্যা করবে না। ” (ইবন আবু শাইবা, মুসান্নাফ: ৩৩৮০৪)
নবীজি নিজেও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন –
# তিনি একজন অমুসলিমকে আবুসিনিয়ার দূত করে পাঠিয়েছিলেন।
# বিভিন্ন যুদ্ধে অমুসলিমরাও মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। যেমন -ওহুদের যুদ্ধে অমুসলিম খোজমান এবং খায়বার যুদ্ধে সাফওয়ান আবু উমাইয়া অংশ গ্রহন করেছিল।
#একবার নাজরান থেকে আগত খ্রীষ্টান প্রতিনিধিদের সহিত মহানবী সা: মদিনার একটি মসজিদে আলোচনা করতেছিলেন। আলোচনার বিরতিতে তাহারা স্বধর্ম অনুসারে প্রার্থনার অনুমতি চাইলে নবীজী তাদেরকে মসজিদের ভিতরেই প্রার্থনার অনুমতি দেন। (ফুতুহুল বুলদান, পৃ, ৭১)
#নবীজীর আমলে জনৈক মুসলমান একজন অমুসলিমকে হত্যা করলে তিনি খুনীকে মৃত্যুদন্ড দেন এবং বলেন, “যে নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তার রক্তের বদলা নেওয়ার দায়িত্ব আমারই।” (ইনায়া শরহে হিদায়া, অষ্টম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৫৬)
*খেলাফতের যুগেও অসাম্প্রদায়িকতার অসংখ্য উদাহরণ আছে। বিশেষ করে হযরত ওমর আ: শাসনামলে যতগুলো দেশ জয় করেছেন – কোথাও কোনো ধর্মীয় উপসানালয়ে আক্রমন করেন নাই। বরং ধর্মান্ধ কিছু মুসলিম অতি উৎসাহে কিছু উপসানালয়ের ক্ষতি করলে, তিনি জানতে পেরে সেগুলি পুনর্নিমাণ করে দেন এবং অমুসলিমদের সাথে সহাবস্থান ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্তে চুক্তি করেন।
বুখারী শরীফে আছে যে রাসুল সা: এরশাদ করেছেন,
” কোনো ব্যভিচারী ব্যভিচার করার সময় মমিন থাকে না, কোনো চোর চুরি করার সময় মমিন থাকে না।”
– সুতরাং এইটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে অপরাধীর কোনো ধর্মীয় পরিচয় নাই। কোনো মুসলিম যদি যেকোন ধরনের অপরাধ করে তাহলে তার ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করা বরং ধর্মকে খাটো করার সামিল। ইসলাম তা কখনও সমর্থন করে না।
আমার কথা
সুতরাং যেটা কোরানে নাই, সাহাবীদের যুগে নাই, আমাদের পূর্ব পুরুষদের আমলে নাই, পীর আউলিয়াদের যুগেও নাই, কোনো ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদরাও বলেন নাই সেটা নিসন্দেহে হিংস্র মানসিকতা সম্পন্ন মানুষদের একটা জঘন্য অপরাধ।
তাই প্রিয় মুসলমান ভাই বোনরা, ইসলামের অপব্যাখ্যাকারী যাদের কথার কোনো সূত্র নাই, কোনো ভিত্তি নাই এই সমস্ত বিপদগামীদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে বোকামী করবেন না। তারা মুসলিম জাহানের কোন ইতিহাসকে follow করছে ? তারা নিজেরাও কি বিশ্বাস করে যে তারা সঠিক পথে আছে? দয়া করে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আমি ইসলাম ধর্মের ইতিহাস এবং কোরান হাদিসের রেফারেন্স সহ কথা বলছি। ধর্মের ঐসব অপব্যাখ্যাকারীদের নিকট হতে আপনাদের সত্যিই আরো সতর্ক হতে হবে। তাদের কোনো কাজই ইসলামিক নয়। তারা আল্লাহকে খুশী করছে না। তারা ইহুদি নাসারদের সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এইটা বেহেশতে যাওয়ার কোনো পথ নয়।
তাই আসুন মহান আল্লাহ ও রাসুলের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই আমাদের দেশটিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির এক মডেল দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করি।
লেখক: অফিসার ইনচার্জ, রামু থানা।





