অনলাইন ডেস্কঃ
বর্জন নয়, যে কোনো মূল্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অর্জন করতে হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বৃহস্পতিবার সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লোটন একরাম।

বি. চৌধুরী বলেছেন, অগণতান্ত্রিক ও অস্থির দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। একমাত্র নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকেও (ইসি) বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং অন্তত নির্বাচনের এক মাস আগ থেকে ভোটের পর ১০ দিন পর্যন্ত শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন রাখেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারলে দেশের ভেতর পারবে না কেন?
একান্ত সাক্ষাৎকারে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী একই সঙ্গে রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের ব্যাপারেও জোরালো বক্তব্য দেন। তার মতে, একমাত্র ভারসাম্যের রাজনীতিই স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে পারে। এ দেশের ইতিহাস থেকে এই শিক্ষাই পাওয়া গেছে, নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে দেশে স্বেচ্ছাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শিগগিরই অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারাসহ কয়েকটি দল রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবিতে ‘যুগপৎ আন্দোলনে’ যেতে পারে। অবশ্য এ দলগুলোর ঐক্য গড়ে ওঠার পথে কিছু বাধাও রয়েছে। তারপরও বিএনপিসহ ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নেতারা এ ব্যাপারে আশাবাদী। সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে কৌশলী জবাব দিয়েছেন ঐক্য গড়তে দফায় দফায় বৈঠককারী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বি. চৌধুরী।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি খুবই নাজুক। গণতন্ত্রের কতটুকু অবশিষ্ট আছে- এটা নিয়ে সন্দেহ হয়। যখন দেখি বিরোধী দল সভা-সমাবেশ, মিছিল করতে পারে না, স্কুল-কলেজের ছাত্রদের গুণ্ডা দিয়ে পেটানো হয়, অথচ গুণ্ডাদের গ্রেফতার না করে যারা মার খায় তাদের গ্রেফতার করা হয়, তখন গণতন্ত্র সম্পর্কে সংশয় জাগে। এসবই গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা। যখন দেখি কারচুপির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচন হয়, তখন সন্দেহ হয়- ভবিষ্যতে সঠিক নির্বাচন হবে কি-না?
বি. চৌধুরী বলেন, যখন দেখি বর্ষীয়ান মন্ত্রী বলেন, ‘ঘুষ’ বলে কিছু নেই, এর নাম ‘স্পিড মানি’, টাকা দিলে তাড়াতাড়ি কাজ হবে; যখন দেখি শিক্ষামন্ত্রী বলেন, রহে-সহে ঘুষ খাবেন; যখন দেখি ঘুষ ও দুর্নীতি সরকারীকরণ হয়ে গেছে; যখন দেখি হত্যা, গুম সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তখন ভাবি, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও দেশের মানুষের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? সারা পৃথিবী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের গ্রেফতারের প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও তাকে যখন ছেড়ে দেওয়া হয় না, তখন ভাবতেই হয়, বিশ্ব জনমতের মূল্য কোথায়?
এ প্রসঙ্গে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, র্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনেক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের অপবাদ দেওয়া হয়। কিন্তু এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য মূলত রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যরাই দায়ী। কারণ তারা এসব বাহিনীকে অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ করতে বাধ্য করেন। আসলে হুকুমদাতারাই অপরাধের মূল হোতা, তারাই মূলত এসব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।
সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কীভাবে সম্ভব- জানতে চাইলে বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট প্রশ্ন তোলেন, একটি অস্থির অগণতান্ত্রিক সরকার শাসিত রাষ্ট্রের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের কোনো ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে পারবে কি? তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রথমত, নিরপেক্ষ সরকার; দ্বিতীয়ত, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কমিশন এবং তৃতীয়ত, অন্তত নির্বাচনের এক মাস আগ থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় (নির্বাচনের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ) সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে কোনো সংলাপের প্রয়োজন নেই। সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে। নির্বাচনে কে আসবে বা কে আসবে না- সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব কথা যারা বলেন, তারা
গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন কি-না- এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন।
সরকার যদি তাদের দাবি না মানে, তা হলে নির্বাচন বর্জন নাকি প্রতিহত করতে আন্দোলনে নামবেন- এ প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বলেন, যে কোনো মূল্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন অর্জন করতে হবে। বর্জন কোনো সঠিক জবাব নয়।
বিএনপির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট-গণফোরামের ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ কবে নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে- এ প্রশ্নের জবাবে বি. চৌধুরী বলেন, বিষয়টি ক্রমশ প্রকাশ্য। অবশ্য ঐক্য গড়ার পথে কোনো অন্তরায় কাজ করছে কি-না- জানতে চাইলে এড়িয়ে যান যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
জানতে চাওয়া হয়, গুঞ্জন রয়েছে বৃহত্তর ঐক্যের প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিকল্পধারার আপত্তি রয়েছে, অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের আপত্তি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গটি সঠিক। দ্বিতীয় গুঞ্জনটি এখনও শুনিনি। মাহমুদুর রহমান মান্না হচ্ছেন যুক্তফ্রন্টের অবিচ্ছেন্দ্য অংশ।
বিএনপির সঙ্গে যদি শেষ পর্যন্ত ঐক্য হয়, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে শীর্ষ নেতা কে হবেন- জানতে চাইলে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, প্রশ্নটি তাত্ত্বিক।
বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক ‘গুণগত’ মান উন্নয়ন হবে কি-না- এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, যদি যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি ও দর্শনের মাধ্যমে ঐক্য হয়, তাহলে ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। একমাত্র ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি স্বেচ্ছাচার, সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাজনীতির ভিত্তি স্থাপিত হতে পারে।
যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান আরও বলেন, ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়- একক দলীয় ক্ষমতা প্রয়োগ রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ায়। ফলে সরকার দেশের স্বার্থের বদলে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। দেশের মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাদের এটাও বুঝতে হবে, ভবিষ্যতে ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।
সূত্রঃ সমকাল






