অনলাইন ডেস্কঃ
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্য ও অসম আইনের শিকার হয়ে শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছেন। উন্নত সমাজ চেতনা থেকে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে প্রচলিত এসব বিধি ও আইনের সংশোধন প্রয়োজন। তাই সার্বজনীন পারিবারিক আইন অর্থাৎ, ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড এখন সময়ের দাবি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন।
তারা বলেন, বাংলাদেশে ঘরে-বাইরে, শ্রেণি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৯১৮ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৯৪২টি এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮২ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে।
শুধু ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ৫২ জন ধর্ষণ, ২২ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই চিত্রের বাইরেও অনেক ঘটনা ঘটে, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। এ অবস্থায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করতে না পারলে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।
‘আসুন যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলি’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম।
সভায় জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, যারা নিজেরা ধর্মের কিছুই মানেন না, তারাও নারীর অধিকার, নারীর সমান উত্তরাধিকারের প্রশ্নে ধর্মের দোহাই তোলেন। যা আমাদের অত্যন্ত পীড়িত করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, নারীকে যদি মানুষ ভাবতে না পারি, তাহলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে না। সংবিধানে জনজীবনে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও পারিবারিক জীবনে সমঅধিকারের কথা কোথাও বলা হয়নি। উত্তরাধিকারের সমানাধিকার না থাকার কারণে নারী প্রতিবাদ, প্রতিরোধ অনেক সময় করতে পারে না।
ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, সমাজে যদি আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্নীতি সব ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করে, তখনই সে দেশের নারী সমাজ সহিংসতার শিকার হয়। তিনি ‘নারীর মর্যাদা আমার মর্যাদা’ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রচারাভিযান চালানোর প্রস্তাব দেন।
সমকালের উপ-সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটিরও বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী। মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। লেখাপড়াসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নেও পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ভূমিকা পালন করছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী পোশাক শ্রমিক, কর্মজীবী নারীদের সংগঠিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আয়শা খানম বলেন, ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর এই সংগঠন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের অভিজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিমালয়সম অর্জন থাকলেও নারীর মানবাধিকার, নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক সাদেকা হালিম, ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, চঞ্চনা চাকমা, বনানী বিশ্বাস, বাসুদেব ধর, মাহবুব জামান, অধ্যাপক ডালেম চন্দ্র বর্মণ, মহিলা পরিষদের সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম, সংগঠন সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম প্রমুখ।
এর আগে সিরডাপের উন্মুক্ত চত্বরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্বোধন করা হয়।জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম।





