প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু:
বুদ্ধের সময় বৈশালী ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। এক প্রতাপশালী রাজবংশ বৈশালীকে শাসন করতেন। কথিত আছে যে, ক্ষত্রিয় বংশের সাত হাজার সাতশত সাত জন রাজা বৈশালীকে ক্রমান্বয়ে শাসন করেছিলেন। ধন ধান্যে পরিপূর্ণ বৈশালীতে হিংসাত্মক তান্ডব, বাদ-বিসংবাদ বলতে কিছুই ছিল না। রাজা, প্রজা, রাজ্য রাজত্ব যেন একই সুতোয় গাঁথা।
হঠাৎ উক্ত রাজ্যে ত্রিবিদ উপদ্রব দেখা দিল। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অমনুুষ্যের উপদ্রবে রাজ্যের মানুষ দুর্বিসহ জীবনের ভার টানতে শুরু করলেন। রাজ্যের অশান্তি এবং প্রজাদের ভোগান্তি রাজাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করল। কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি। তরবারি দিয়ে কিংবা চতুরঙ্গিনী সেনাদল দ্বারা তো এর সমাধান হবে না। প্রজাবৎসল রাজার মনের প্রতিটি কোণে কষ্ট জমাট বাঁধতে শুরু করল। রাজা এবং অমাত্যবর্গ পরিত্রাতা বুদ্ধের শরণে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন।
বুদ্ধ তখন রাজা বিম্বিসার কর্তৃক দানকৃত পূর্বারাম বিহারে অবস্থান করছিলেন। বৈশালীবাসীর পক্ষে মহালি লিচ্ছবির রাজা পুরোহিত পুত্রকে নৃপতি বিম্বিরারের কাছে পাঠানো হল। তারা প্রেরিত সংবাদটি রাজকীয় শিষ্টাচার বজায় রেখে রাজার সামনে নিবেদন করলেন। বৈশালীর কল্যাণে রাজা প্রমূখ প্রেরিত প্রতিনিধিগণ বুদ্ধকে সবিনয়ে ফাং (নিমন্ত্রণ) করলেন।
বুদ্ধ পাঁচশত ষড়াবিজ্ঞ অর্হৎ সহ বৈশালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। বুদ্ধ অন্তপ্রাণ রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের যাতে কষ্ট না হয় গমনা গমনের সকল রাস্তা সুসজ্জিত করে দিলেন। রাজগৃহ এবং গঙ্গার মধ্যখানে পাঁচযোজন ভূমি স্থান করে প্রতিযোজন অন্তর অন্তর জানুপ্রমাণ গভীর পঞ্চবর্ণের পুষ্পরাজি ছিটিয়ে দিলেন। ধ্বজা পতাকা ও কদলী বৃক্ষাদি প্রোথিত করলেন। ছোট এবং বড় দুইটি শ্বেতচ্ছত্র ভগবানের মস্তকোপরি ধারণ করে সপরিবারে পুষ্পগন্ধাদির দ্বারা পূজা করতে করতে বুদ্ধকে এক একটি বিহারে বিশ্রাম করিয়ে মহাদানাদি কর্ম সম্পাদন করে পাঁচ দিন পর গঙ্গাঁতীরে উপনীত হয়ে সেখানে নৌকা সজ্জিত করে বৈশালী বাসীদের সংবাদ পাঠালেন। তাঁরাও দ্বিগুন পূজা করবে বলে বৈশালী এবং গঙ্গাঁর মাঝখানে ত্রিযোজন ভূমি সমান করে বুদ্ধের উপর চারটি শ্বেতচ্ছত্র এবং অন্যান্য ভিক্ষুদের প্রত্যেকের মাথার উপর দুইটি করে শ্বেতচ্ছত্র ধারণ করে এইগুলো দ্বারা বুদ্ধকে পূজা করার মানসে গঙ্গাঁতীরে উপস্থিত হলেন। রাজা বিম্বিসার দুইটি নৌকা একত্রে বেঁধে তার উপরে মন্ডপ সজ্জিত করে সর্বরত্নময় বুদ্ধাসন প্রস্তুত করলেন। বুদ্ধ উক্ত আসনে উপবেশন করলেন। অপরাপর ভিক্ষুগণ বুদ্ধকে ঘিরে উপবেশন করলেন। মহারাজা বিম্বিসার গলঃপ্রমাণ জলে নেমে করজোড়ে বুদ্ধকে বিদায় জানালেন।
বুদ্ধ যে কয়দিন রাজগৃহের বাইরে ছিলেন সে কয়দিন বুদ্ধ ফিরে না আসা পর্যন্ত রাজা গঙ্গাঁতীরে অবস্থান করেছিলেন। বুদ্ধ সশিষ্যে বৈশালীতে পদধূলি দিলেন। বুদ্ধ বৈশালীতে পা রাখার সাথে সাথে প্রবল বর্ষণ শুরু হল। রাজা, প্রজা, এবং অমাত্যবর্গ বুদ্ধকে মহাসমারোহে পূজা করলেন। বুদ্ধ প্রধান সেবক ধর্মভান্ডাগারিক আনন্দ স্থবিরকে নগরের চতুর্দিকে রতনসূত্র পাঠ করতে বললেন। আনন্দ স্থবির নগরীতে পদচারণ পূর্বক রতন সূত্র পাঠের সাথে সাথে জল ছিটালে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। রাজ্যের সর্বপ্রকার উপদ্রব মূহুর্তের মধ্যে বিদূরিত হল এবং বৈশালীবাসীর অন্তহীন দুর্দশা নিবারণ হল। সমগ্র বৈশালীবাসী আনন্দে উদ্বেলিত হল। যেন তাদের পুনঃজন্ম হল। বুদ্ধ বৈশালী থেকে বিদায় নিলেন। বৈশালীবাসী যথাযোগ্য পূজার মাধ্যমে বুদ্ধকে বিদায় জানালেন।
এদিকে নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দূর্লভ সুযোগ তারা হাত ছাড়া করবে না। সাথে সাথে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মত পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমূখ পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করল। এইভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেই দিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধ্বজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা লাভ করে পুণরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস।
মূলত এই হৃদয়ছোঁয়া চিরভাস্বর স্মৃতিসম্ভারকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা দিবসে নিকটবর্তী র্বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত কাগজী কল্পজাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উদযাপন করেন। কক্সবাজার সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাখাইন এবং মগ সম্প্রদায়ও জাহাজ ভাসা উৎসব পালন করে থাকেন।
তবে সেইদিন নাগ, দেব, ব্রহ্মা যেভাবে পেরেছিলেন বর্তমান সময়ের মানুষ তা অবিকল পারার কথা নয়। ক্ষেত্র বিশেষে এর বিকৃতি অবস্থাও হয়েছে। তবে এইক্ষেত্রে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে, বৌদ্ধ ধর্মে বিনা কারণে কিংবা মনের হরষে আদর্শ উদ্দেশ্য বিনা কোন উৎসব পালনের বালাই নেই। বুদ্ধকে সম্মান প্রদর্শন এবং ঐতিহ্যকে লালন করার জন্য আমরা জাহাজ ভাসা উৎসব পালন করে থাকি।
যারা জাহাজ ভাসা উৎসবে যোগদান করেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাতাল হয়ে ধর্মীয় ভাবলেশহীন গান বাজনায় মেতে উঠতেও দেখা যায়। আর অনেক অবৌদ্ধ দর্শণার্থীরা মনে করেন এটা বুঝি ধর্মের অঙ্গ। আসলে এটা কখনো ধর্মের অঙ্গ হতে পারে না। বিকৃতি রুচি মাত্র।
আমরা প্রথম বার যখন উদ্যোগ নিয়ে এই অনুষ্ঠান উদযাপন করি তখন আমরা এসব বিষয়ে পূর্ণ সতর্ক ছিলাম। এক্ষেত্রে উদযাপন পরিষদ এবং যেসকল গ্রাম থেকে জাহাজ নামানো হয় সেসকল গ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া যায়। আর জাহাজে শিশু এবং সাঁতার না জানা কোন ব্যক্তি যাতে উঠে না পড়েন সেটাও দেখতে হবে।
আইন-শৃংখলার বিঘ্ন ঘটে এমন যেকোন ধরণের সমস্যা মোকাবেলায় প্রশাসন সর্বদা প্রস্তুত আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসন দৌড়েঁর উপর আছেন এটা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। অথচ জাহাজ ভাসা উৎসবে ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা উপভোগ করতে গেলেও এযাবৎ তারা কোন অঘটন ঘটিয়েছেন বলে জানা নেই। সমস্যা হয় নিজেদের অসতর্কতার কারণে। অনুষ্ঠান পুরো ষোল আনা সফল এবং সার্থক হয় মত আমাদের আরো বেশি সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।
আমরা আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে লালন এবং পালন করব কিন্তু ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে এমন কোন কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। এসব দৃষ্টিকটু এবং অসামাজিক কর্মকান্ডের দ্বারা জাতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতি সব কিছুর ক্ষতি হয় একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।
বাংলাদেশ চিরজীবি হউক।






