প্রতিদিনের খাবার তালিকায় ডিম অন্যতম উপাদান। সকালের নাস্তায় সেদ্ধ, বিকেলের নুডলসে ভাজি অথবা কেক বা পুডিংয়ের মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে ডিম খাওয়া হয়ে যায়।
তবে কেউ কেউ ডিম খাওয়ার পর অস্বস্তি অনুভব করেন। কারও গায়ে চুলকানি হয়। আবার কারও পেটে ব্যথা কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
এসব উপসর্গকে অনেকেই হালকাভাবে নেন, ভাবেন হয়ত খাবার ঠিকমতো হজম হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হতে পারে ডিমের প্রতি অ্যালার্জির লক্ষণ।
ডিমে অ্যালার্জির কারণ কী?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ‘কাইজার পারমানেনট’-এর অ্যালার্জি, হাঁপানি ও ‘ইমিউনোলজি’ বিভাগের প্রধান ডা. থুই লিয়েন লাই ওয়েলঅ্যান্ডগুড ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “ডিমের মধ্যে থাকা প্রোটিনকে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে ক্ষতিকর ভাবলে তখনই অ্যালার্জি দেখা দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ দুটাই অ্যালার্জির জন্য দায়ী হতে পারে। তবে ডিমের সাদা অংশে অ্যালার্জিক প্রোটিন বেশি থাকে। তাই এর থেকে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি।”
‘ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার নিউ অরলিন্স’-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কম্বোজ বলেন, “ডিমের সাদা অংশে থাকা তিনটি প্রোটিন- ‘ওভোমিউকয়েড’, ‘ওভালবুমিন’, ‘ওভোট্রান্সফেরিন’— অ্যালার্জির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। এই প্রোটিনগুলো শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে এবং অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটায়।”
অ্যালার্জির পেছনে কার ভূমিকা বেশি— বংশগতি না পরিবেশ?
‘শোয়াইগার ডারমাটোলজি গ্রুপ’-এর অ্যালার্জি ও ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. সুজানা সিলভারম্যান একই প্রতিবেদনে বলেন, “ডিমসহ যে কোনো খাদ্য অ্যালার্জির পেছনে থাকে জেনেটিক বা বংশগতি এবং পরিবেশগত কারণ। যদি বাবা-মা’র মধ্যে কেউ খাদ্য অ্যালার্জিতে ভুগে থাকেন, কিংবা হাঁপানি বা একজিমার মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে ডিমে অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।”
শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও হতে পারে আক্রান্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিকভাবে ডিমে অ্যালার্জি শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই শতাংশ শিশু ডিমে অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হয়। তবে আশার কথা হলো, এদের ৭০ শতাংশ শিশু ছয় বছর বয়সের মধ্যে এই অ্যালার্জি থেকে মুক্তি পায়। এরপরও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ০.১ শতাংশ থেকে ০.২ শতাংশ মানুষ স্থায়ীভাবে ডিমে অ্যালার্জি নিয়ে বসবাস করেন।
ডিমে অ্যালার্জির লক্ষণ
ডিম খাওয়ার পর শরীরে যদি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তবে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ডা. থুই লিয়েন লাই বলেন, “অ্যালার্জির ফলে শরীর হিস্টামিন নামক রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা পুরো শরীরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।”
প্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণত ডিম খাওয়ার কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দেয়। কেউ কেউ এক টুকরা কেক খেয়েই আক্রান্ত হন, আবার কেউ পুরো সেদ্ধ ডিম খাওয়ার পর সমস্যা অনুভব করেন। প্রতিটি মানুষের প্রতিক্রিয়া আলাদা।
ডিমে অ্যালার্জি নাকি ডিম সহ্য করতে না পারা?
অনেকে ভাবেন ‘আমি ডিম খাওয়ার পর একটু অস্বস্তি অনুভব করি, কিন্তু খেতে তো পারি!”
এটা হতে পারে ডিম সহ্য করতে না পারা; তবে অ্যালার্জি নয়।
ডা. থুই লিয়েন লাই ব্যাখ্যা করেন, “ডিম ‘ইনটলারেন্স’ মানে হল, হজম প্রণালী ডিম ভালোভাবে ভাঙতে বা গ্রহণ করতে পারে না। এতে পেট ব্যথা, গ্যাস, বমিভাব বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। তবে এটি ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা নয়, তাই প্রাণঘাতীও নয়।”
অন্যদিকে ডিমের অ্যালার্জি থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়লে পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। তাই ‘ইনটলারেন্স’ বা সহ্য না হলে মাঝে মাঝে ডিম খাওয়া সম্ভব হলেও অ্যালার্জির ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা ভালো।
ডিম ছাড়াও জীবন চলে—আছে বিকল্প উপায়
ডিম সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাবার। তবে সত্যিই যদি ডিম অ্যালার্জিক হন, তাহলে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়াই ভালো। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ অনেক বিকল্প রয়েছে।
যেমন- বেইকিংয়ের ক্ষেত্রে ডিমের বদলে মেশানো যায় দই, আপেলের পিউরি, ভিনেগার, বেইকিং সোডা, কলা বা চিনাবাদামের মাখন।
এছাড়া বিভিন্ন খাবারে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে মাছ, মাংস, ডাল ও সয়াবিন রাখা যেতে পারে।
বিডিনিউজ







