কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরির্তনের কারণে অনেকেই উন্নত জীবনের আশায় পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়েন। বিপদজনক সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। সমুদ্রপথে মানবপাচারের জন্য নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার। গত কিছুদিন ধরে আন্দামান সাগর দিয়ে সমুদ্রপথে মানবপাচারের ঘটনা বেড়েছে। সমুদ্রে অনেকেই এভাবে প্রাণ হারাচ্ছে বোট ডুবে বা পাচারকারীদের নির্চাতনে।সোমবার (২০ এপ্রিল) কক্সবাজার শহরের হর্টিকালচার সেন্টার কনফারেন্স রুমে আয়োজিত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালায় বক্তারা এ কথা বলেন।
মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গণমাধ্যমকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্ততা করেন, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সৈকতের সম্পাদক মাহবুবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন, ব্র্যাক কক্সবাজার জেলা সমন্বয়কারী অজিত নন্দী।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, মানবপাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্রেরও সম্মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অপরাধ চক্র ভাঙতে এবং জনসচেতনতা তৈরিতে সাংবাদিকদের ভূমিকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালায় সাংবাদিকরা বলেন, প্রস্তুতি নিলে, জনগণকে সচেতন করা গেলে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এক্ষেত্রে সাংবাদিকরা তাদের কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারেন এবং পাচারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারেন। পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। ভালো বেতন আর রঙিন জীবনের লোভ দেখিয়ে পাচারকারীরা মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে। অনেকেই বিদেশে জেল খেটে সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফেরেন। না হয় সাগর পথে বা বিদেশের অজানা স্থানে মৃত্যুবরণ করেন।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এই কর্মশালাটি আয়োজন করে।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি অভিবাসন ও মানবপাচারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “একজন গণমাধ্যমকর্মীকে সংবাদের গভীরে গিয়ে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে হবে।”
কর্মশালায় মানবপাচার সংক্রান্ত প্রতিবেদন করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন দৈনিক প্রথম আলোর কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আবদুল কুদ্দুস রানা। তিনি বলেন, তথ্য যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন করতে হবে। সংবাদের গভীরে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের (অভিবাসন কর্মসূচি ও যুব প্ল্যাটফর্ম) সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। তিনি মানবপাচার, মানব চোরাচালান ও অনিয়মিত অভিবাসনের নানা দিক এবং এর ভয়াবহতা তুলে ধরেন। বিশেষ করে আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানে যাওয়ার সময় কীভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন এবং জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি এই বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সাথে গণমাধ্যমে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
কক্সবাজারের স্থানীয় পাচার মোকাবেলা এবং চোরাচালানের বাস্তবতা বিষয়ে আলোকপাত করে কর্মশালায় বক্তৃতা করেন, বিএনডব্লিউএলএ কক্সবাজারের আইন পরিষেবা সমন্বয়কারী বিশ্বজিৎ ভৌমিক। কর্মশালায় মানবপাচারকারী খপ্পরে পড়া এবং মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা দুই ব্যক্তি নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া নির্যাতন ও পাচারের গল্প উপস্থাপন করেন।
মানব পাচার ও লোক চোরাচালান প্রতিরোধে গণ অভিযান’ প্রকল্পের আওতায় অনুুষ্ঠিত কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে কর্মরত কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলার ৫৩ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা পাচার প্রতিরোধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের সনদ প্রদান করা হয়।






