দেশের শিক্ষকদের বিশেষ করে স্কুল-মাদ্রাসার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে সরকারের কাজ করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।
সোমবার বিকালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, “দেশের শিক্ষকদের বিশেষ করে স্কুল-মাদ্রাসার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান এবং শিক্ষকতা পেশাকে সুযোগ ও সম্মানের দিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষকতা পেশা কখনই উপায়হীন বিকল্প কিংবা একটি সাধারণ চাকরির মত হতে পারে না।
‘‘বরং শিক্ষা দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতা পেশাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সরকার শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজাচ্ছে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র ও সমাজে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।“
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের শতাধিক গুণী শিক্ষককে সন্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। সম্মাননার অংশ হিসেবে প্রত্যেক গুণী শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ জন, কলেজ পর্যায়ে ২৫ জন, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ২০ জন, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনজন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনজন এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চারজন শিক্ষককে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত সাতজন শিক্ষককেও সম্মাননা দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী শিক্ষক দিবস পালিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা দেশে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষা জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে কেউ কোনো কারণে ড্রপ আউট হলেও যেন কাউকে বেকার থাকতে না হয় সেটি নিশ্চিত থাকা জরুরি।
‘‘শিক্ষা খাত বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। দেশের ইতিহাসে এবারেই প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাজেট আরো বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপ্তি অনেক বড়। দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান এবং তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।”
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এ আলোচনা সভা হয়।
শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে থাকে।
সারা বিশ্বের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আজকে যারা গুণী শিক্ষক হিসেবে পুরস্কৃত হলেন আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাই। এভাবেই সমানিত শিক্ষকগণ যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা দীক্ষার মাধ্যমে একজন সুনাগরিক হিসেবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা আমাদের জন্য আরো সহজ হয়ে উঠবে।
‘‘পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পার হওয়ার পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক শিক্ষিকারাই হচ্ছেন ‘আদর্শ রোল মডেল’। শিক্ষক শিক্ষিকারা যাতে নিজেকে একজন রোল মডেল হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারেন (সেজন্য) বর্তমান সরকার সে ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করছে।”
‘নতুন সিলেবাস: শিখন পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বর্তমানে সোশাল মিডিয়ার বিকাশ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই সময়ে প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে এসে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বিকল্পহীন হয়ে উঠেছে। সুতরাং, শিখন এবং শিক্ষন পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তন এবং শিক্ষা সিলেবাসের আধুনিকায়ন এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।
‘‘বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাচ্ছে। সুতরাং শিক্ষার্থীরা যাতে বই বিমুখ হয়ে না ওঠে এ ক্ষেত্রে শিখন ও শিক্ষন পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুখস্থ করার চেয়ে কেন এবং কীভাবে এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলা জরুরি।
“কৌতূহল থাকলে শিক্ষার্থী নিজেও নিজের শিক্ষক হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই স্কুলের সিলেবাস আধুনিকায়ন করেছে। শিখন কৌশল হিসেবে আনন্দময় শিক্ষা সারাবিশ্বেই বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে।”
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বই’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস শিরোনামে একটি নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে।
“শিক্ষার্থীগণ যাতে আনন্দের সঙ্গে লেখাপড়া করতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে এ ধরনের উদ্যোগ। পর্যায়ক্রমে অন্য ক্লাসেও এই বই দেওয়া হবে।”
সরকারের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বর্তমানে আমরা এমন একটি সময়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করছি যখন শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একদিকে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অবারিত করেছে। সার্টিফিকেট নির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে বর্তমানে কারিগরি এবং ব্যাবহারিক জ্ঞান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তথ্য প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামনেও এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
“সুতরাং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর আরও আধুনিকায়নও জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তিকে আমরা শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না। বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি। এই লক্ষ্যেই আমরা ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচিকে এগিয়ে নিচ্ছি। একজন শিক্ষক তার ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষন সামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।”
‘শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্য’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা অস্বীকার করতে পারি না দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে শহরাঞ্চল কিংবা গ্রামাঞ্চল সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই যাতে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে সরকারেরে নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে।
‘‘শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।”
তিনি বলেন, ‘‘কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন। তবে আমাদেরকে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় বরং নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন অবশ্যই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যানেরও কারণ হতে পারে।
‘‘সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা এবং অন্যের প্রতি সম্মান- এসব মূল্যবোধ আমাদের শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষা-শিক্ষিকাগণই সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।“
‘শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবসসহ প্রতিবছর বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। শুভেছা বিনিময় করে থাকেন।
‘‘এ ধরনের জাতীয় দিবসগুলোতে আমন্ত্রিতদের তালিকায় একটি নীতিমালার ভিত্তিতে চলতি বছর থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলের কমপক্ষে একজন করে শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিচ্ছি।”
তিনি বলেন, ‘‘একজন শিক্ষক তিনি কর্মরত কিংবা অবসর জীবনে যেভাবেই থাকুনা তার সুমহান পেশার কারণেইআমৃত্যু তিনি রাষ্ট্রের কাছে অবশ্যই সম্মানীয়। এজন্য আমি ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছি,একজন শিক্ষক শুধু তার বেতন কিংবা অবসরভাতার জন্য কষ্ট করে অফিসে ঘোরার প্রয়োজন নেই।
‘‘যথানিয়মে যথাসময়ে তার প্রাপ্ত অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমেই তাকে পৌঁছে দিতে হবে। দেশের শিক্ষকগণই হচ্ছেন জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র-সমাজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।“
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হকের সভাপতিত্বে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা বিষয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ ও শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বক্তব্য রাখেন।
বিডিনিউজ







