সুনীল বড়ুয়া:
মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন আগুন দিচ্ছিল তখন ঘরে ঘুমিয়ে ছিলো ১৮ মাসের ছোট্ট শিশু হারেছ। সন্তানকে উদ্ধারে মায়ের দৌড় ঝাঁপের আগেই ছনের ছাউনি থেকে আগুনের ফুলকি গিয়ে পড়ে ঘুমন্ত হারেছ-এর গায়ে। আগুনে লাল হয়ে যায় নিষ্পাপ হারেছ এর নরম শরীর। এখন হারেছ-এর ঠিকানা কক্সবাজার সদর হাসপাতাল। এ হাসপাতালে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য খোলা হয়েছে ‘স্পেশাল রোহিঙ্গা ইউনিট’।
বুধবার ( ২০ সেপ্টেম্বর) রাতে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ‘স্পেশাল রোহিঙ্গা ইউনিটের ২২২ নম্বর কক্ষে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে হারেছ। পুরো শরীর সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। পাশেই ঘুমিয়েছে তার মা খুরশিদা বেগম।
খুরশিদা জানান, তাদের বাড়ি মিয়ানমারের বুচিডং এলাকায়। তার স্বামী আব্দুল হামিদ ছিলেন একজন দিন মজুর। দুই সপ্তাহ আগে টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অগ্নিদগ্ধ সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন খুরশিদা।
খুরশিদা বলেন,‘ মিয়ানমার সেনাবাহিনী উপর থেকে বোমা মারছে,গুলি মারছে। আমাদের ঘরটি ছিলো ছনের ছাউনীর। এক পর্যায়ে ঘরের ছাউনীতে আগুন ধরে যায়। আগে থেকেই ঘরে ঘুমিয়ে ছিলো হারেছ। আমি দৌড়ে হারেছকে বের করতে যাই। কিন্তু ততক্ষনে আগুনের শিখা ঘুমন্ত হারেছ-এর গায়ের উপর পড়ে। আগুনে লাল হয়ে যায় হারেছ-এর শরীর। বুকের উপর থেকে নীচের দিকে পুড়ে গেছে। পোড়া ছেলেকে নিয়ে পাহাড়-পর্বত,খাল-বিল পেরিয়ে অনেক কষ্টে আমরা বাংলাদেশে আসি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাক্তার দেখা মাত্র আমাদের এই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এখানে আছি আজ (২০ সেপ্টেম্বর) ১১দিন হয়েছে।
সেই ইউনিটের কর্তব্যরত সেবেকিা সাকিবা জানান,হারেছ-এর শরীরের ১৫ ভাগ পুড়ে গেছে। শরীরের পোড়া ক্ষত শুকিয়ে আসছে। তবে শিশুটি এখন অনেকটা শংকামুক্ত।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের স্পেশাল রোহিঙ্গা সার্জারী ইউনিটের ১২১ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন শাহাজান-এর নিজের দেশ ছেড়ে আসার গল্পও আরো নির্মম। আগুনে মুখমন্ডলসহ শরীরের পুরোটাই পুড়ে গেছে শাহাজানের। আগুনে পুড়ে নিজেকে বাঁচাতে পারলেও মিয়ানমার সেনাদের ছোঁড়া গুলি থেকে স্বামী ও ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি শাহাজান।
শাজাহান জানান, ওইদিন দুপুর আড়াইটা হবে। সেনাবাহিনী পাড়ার বাড়ি-ঘর পুড়ে দিচ্ছে। আমার ঘরেও অঅগুন ধরিয়ে দেয়। আমি স্বামী আর ছেলেকে খুঁজতে দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি। এ সময় আমার পরনের কাপড়ে আগুন ধরে যায়। পাশে একটি ধান ক্ষেত ছিলো। আমি দৌড়ে ধান ক্ষেতে গিয়ে গড়াগড়ি করি,কিন্তু ততক্ষনে আমার পুরো শরীরে আগুন ধরে যায়। পরে জানতে পারি ঘর থেকে দৌড়ে পালানোর সময় আমার স্বামী (শফি উল্লা) ও ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমার মেয়ের জামাই আমাকে ধান ক্ষেত থেকে উদ্ধার বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এখন এখানে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ তিনি। কিন্তু নিজের শরীর পুড়িয়ে প্রাণে বাঁচতে পারলেও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বামী ও সন্তান হারানোর বেদনা।
গত ১২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাচিঢং এলাকা থেকে বাংলাদেশে ঢুকেন শাহাজান। ওই দিন রাতে তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি হন।
কিশোরী আলকামার বাড়ি ছিলো মিয়ানমারের মংডু এলাকায়। চারদিন আগে টেকনাফের নাইট্যং পাড়া সীমান্ত দিয়ে মায়ের সংগে বাংলাদেশে আসে কিশোরী আলকামা। বাবা ও বোনের মৃত্যু দেখেছে একদম কাছ থেকে। গুলিবিদ্ধ বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের পায়ের গোঁড়ালীতে গুলি লাগে তার। এখন তারও ঠিকানা এই হাসপাতাল। আলকামা বলেন, ‘ ওরা আমার বাবাকে গুলি মেরেছে,আমি বাবাকে ধরতে গেছি। আমাকেও গুলি মেরেছে। আমার পায়ে গুলি লাগে। আমার বোন গেছে,বোনকেও গুলি মেরেছে। আমার বাবা মারা গেছে। আমার বাবা ও বোন দুজনই গুলিতে মারা গেছে।
শুধু এরা নন, মিয়ানমারে বাহিনীর নির্যাতনের শিকার এ রকম অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশুর ঠিকানা কক্সবাজার সদর হাসপাতাল। শতভাগ সরকারী খরচে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে এই হাসপাতালে। অগ্নিদগ্ধ, গুলিবিদ্ধ, ধর্ষিতাসহ নানাভাবে আক্রান্তের শিকার অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সেবা নিশ্চিত করতেই কক্সবাজার সদর হাসপাতালে খোলা হয়েছে স্পেশাল রোহিঙ্গা সার্জারি ইউনিট। বাড়ানো হয়েছে চিকিৎসকসহ সকল ধরনের সাপোর্ট।
তবে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান এই হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শাহীন মোহাম্মদ আব্দুর রহমান।
তিনি বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে আগে থেকেই প্রতিদিন ৫০০’শরও বেশি রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যাটি আমাদের চাপের মধ্যে আরো বাড়টি চাপ হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে ইনজুরি কেইস নিয়ে,গুলিবিদ্ধ,অগ্নিদগ্ধ,দূর্ঘটনা কবলিত রোগীদের নিয়ে। তবে রোহিঙ্গা রোগীদের শতভাগ সরকারী খরচে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা.মো. আব্দুস সালাম জানান, রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গাদের জন্য স্পেশাল ইউনিট খোলা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যেখানে অবস্থান করছে,সেখানে মাঠ পর্যায়ে ৩৬টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
আন্তজার্তিক সংস্থা গুলো যেমন আইওএম,ইউএনএইচসিআর,ইউনিসেফ,এসিএফসহ বিভিন্ন সংস্থা আমাদের কর্মীদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের এ চাপ সামলাতে কমিউনিটি ক্লিনিক,ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,এমন কি জেলা সদর হাপাতালেও জনবলসহ সকল ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো হয়েছে।
সিভিল সার্জন জানান, শুধুমাত্র ৭ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯দিনে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। যেখানে আছে গুলিবিদ্ধ, অগ্নিদগ্ধ, ডায়রিয়া,নিয়োমোনিয়া,চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগি রয়েছে।






