
৫ ফুট ১১ ইঞ্চি লম্বা টেকনাফের আয়াস যখন বোলিংয়ের জন্য রানআপ শুরু করেন, তখন কাঁপুনি ধরে অনেক ব্যাটসম্যানের বুকে। অব্যর্থ উইকেট–শিকারি ১৮ বছরের এই তরুণ এলাকায় ‘মুস্তাফিজ’ হিসেবে পরিচিত। নিজেকে পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলতে ভর্তিও হয়েছিলেন চট্টগ্রামের একটি ক্রিকেট একাডেমিতে। কিন্তু খরচ জোগাতে না পেরে ছেড়েও দিয়েছেন আবার। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। সুযোগ পেলেই মুস্তাফিজের মতো বিশ্ব কাঁপাবেন, এমন স্বপ্ন দেখছেন এখনো।
মাস কয়েক আগে টেকনাফের ১৬টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ দিনব্যাপী ‘ক্রীড়াঙ্গন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’। গত ৬ জুন এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় টেকনাফ অলিয়াবাদ ফানি ফ্রেন্ডশিপ ক্রিকেট একাদশকে ৪৪ রানে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় টেকনাফ ক্রিকেট স্পোর্টিং ক্লাব। আর ওই ক্লাবের হয়ে আয়াস উদ্দিন হয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ ও ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট। টুর্নামেন্টে তিনি ১৪ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি রান করেছেন ১২৭টি।
ক্রীড়াঙ্গন ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পরিচালক ও টেকনাফ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আয়াস উদ্দিন অন্যদের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম। তিনি অলরাউন্ডার। তাঁকে ভালো প্রশিক্ষণ দিলে বাংলাদেশের ক্রিকেট আরও একটি প্রতিভা পাবে।
টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দুর্গম উত্তর শিলখালী গ্রামে ১৯৯৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জন্ম আয়াসের। ছোটবেলায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবা নেয়ামত উল্লাহ সওদাগর ছেলেকে বেট-বল কিনে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ক্রিকেটের প্রতি নেশা তাঁর। আয়াসের ক্লাবের কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়েরা জানান, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৯৪টি ম্যাচ খেলে উইকেট অর্জন করেন ২৪৪টি, রান নিয়েছেন ২ হাজার ৭৭৭টি, ক্যাচ ধরেছেন ৯৮টি। এ ছাড়া তাঁর অর্ধশতক আছে ১৪টি এবং শতক আছে দুটি। এ নিয়ে তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হয়েছেন ৪২ বার। ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছেন পাঁচবার।
আট ভাইবোনের মধ্যে আয়াস তৃতীয়। বড় ভাই রিয়াজ মোর্শেদ সৌদিপ্রবাসী। তাঁর উপার্জনে চলে টানাপোড়েনের সংসার। আয়াসের মা হাছিনা বেগম অসুস্থ। টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না।
আয়াস বলেন, ২০১৩ সালে বাবা তাঁকে ক্রিকেটার বানানোর জন্য চট্টগ্রাম ইস্পাহানি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। বাবার ইচ্ছা ছিল তিনি বড় ক্রিকেটার হবেন। কিন্তু গত বছর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আসতে হয় আয়াসকে। তবে নিজের মতো করে প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন এখনো। পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে বাড়ির পাশে তৈরি করেছেন ক্রিকেট পিচ। সেখানে বিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেদের নিয়ে চলে তাঁর প্রতিদিনের ক্রিকেট প্রশিক্ষণ।
কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, টেকনাফ সমুদ্র উপকূলীয় দুর্গম বাহারছড়াতে পড়ে আছে ক্রিকেটের অনন্য এক প্রতিভা। জাতীয় পর্যায়ে খেলার সব যোগ্যতা আয়াসের আছে। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন না তিনি।
কক্সবাজার ক্রীড়া লেখক সমিতির সভাপতি এম আর মাহবুব বলেন, আয়াস সত্যিই প্রতিভাবান। বিসিবির সুনজরে পড়লে মুমিনুল হক ও সৌরভের মতো আয়াসও কক্সবাজারবাসীর মুখ উজ্জ্বল করবেন।
প্রতিবেদন: প্রথম আলো।






