রামুতে বৌদ্ধদের স্বর্গপুরী উৎসব সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। শনিবার (১৯ এপ্রিল) রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের অনুষ্ঠিত হয়েছে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী স্বর্গপুরী উৎসব। বৌদ্ধদের মতে, সংসার চক্রে ঘুরতে ঘুরতে একমাত্র জীবদ্দশার ভালো কর্মের প্রভাবেই একপর্যায়ে মানুষ স্বর্গে আরোহণ করতে পারে। আবার পুনঃজন্মগ্রহণ করে মর্ত্যলোকে ফিরে আসে। বৌদ্ধদের স্বর্গ নিয়ে এ ধরনের ধারণা থেকেই দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে এখানে এ উৎসবের আয়োজন চলছে। দিনব্যাপী এ স্বর্গপুরী উৎসবে সকালে প্রভাতফেরী সহকারে বুদ্ধপূজা, জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কারদান, দুপুরে অতিথি ভোজন, নানান সাজে দলীয় নৃত্য, বিকালে আলোচনা সভা, সন্ধ্যায় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বুদ্ধকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ ৩৯ বছর আগে প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের তৎকালীন বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত প্রজ্ঞামিত্র মহাথের উক্ত স্বর্গপুরী উৎসবের প্রবর্তন করেন। তাঁর জীবদ্দশায় উক্ত ধর্মীয় উৎসব জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রিয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সানন্দ উপস্থিতিতে সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে স্বর্গপুরী উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। ২০০৭ সালে প্রজ্ঞামিত্র মহাথের’র প্রয়াণ হলে, তার অগ্রজ শিষ্য সারমিত্র মহাথের স্বর্গপুরী উৎসবের হাল ধরেন। পরে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল সারমিত্র মহাথের’র প্রয়াণ হলে, প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের বিহারের দায়ক-দায়িকা ও গ্রামবাসীরা স্বর্গপুরী উৎসবের আয়োজন ধারা অব্যাহত রাখেন।
কেন এই স্বর্গপুরী উৎসব? কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ থের জানান, ত্রিপিটকে ৩১ লোকভূমির কথা উল্লেখ আছে। ২০ ব্রহ্মলোক, ৭ কামসুগতি ভূমি, এবং ৪ অপায় ভূমি। বুদ্ধের মতে, নির্বাণ সাক্ষাৎ না করা অবধি যার যার কর্মফল অনুযায়ী সত্ত্বগণকে এসকল লোকভূমিতে ঘুরপাক খেতে হয়। অর্থ্যাৎ জন্ম-মৃত্যু, উৎপত্তি-চ্যুতি এবং আসা-যাওয়ার কবলে পড়তে হয়। মূলত এটিই পুনর্জন্ম দর্শন। ৩১ লোকভূমির মধ্যে একমাত্র অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ভূমি হলো, ৫ শুদ্ধাবাস ব্রহ্মভূমি। এই ৫ শুদ্ধাবাস ব্রহ্মভূমিতে কেবল মনুষ্যলোকে ধ্যান-সমাধি বলে অনাগামী মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই উৎপন্ন হতে পারেন। অনাগামী মানে তিনি সংসারে আর গমনাগমন করবেন না। তিনি আগামী এক জন্মের মধ্যেই শুদ্ধাবাস ব্রহ্মভূমি থেকেই নির্বাণ সাক্ষাৎ করবেন।
প্রজ্ঞানন্দ থের আরও জানান, এই ৫ শুদ্ধাবাস ব্রহ্মভূমি ছাড়া অবশিষ্ট ২৬ লোকভূমির যেখানেই সত্ত্বগণের পুনর্জন্ম তথা উৎপত্তি ঘঠুক না কেন, তাকে সেখান থেকে চ্যুত হতে হয়। এমনকি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হলেও সেখানেও স্থায়ী হওয়া যায়না। নির্দিষ্ট পরমায়ু শেষ হলে, সেখান থেকেও চ্যুত হতে হয়। মূলত, স্বর্গপুরী উৎসবে এই দর্শনটাকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই এটির অপর নাম সংসারচক্র মেলা। স্থানীয়রা এটাকে ব্যুহচক্র কিংবা প্যাঁচঘর বলে থাকেন।
শনিবার (১৯ এপ্রিল) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থীর অংশ গ্রহণে অঅনুষ্ঠিত হয় স্বর্গপুরী উৎসব, ব্যুহচক্র মেলা ও বৌদ্ধ মহাসন্মেলন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের রামু চা বাগান স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে গেলেই ছায়া সুনিবিড় উত্তর মিঠাছড়ি গ্রাম। গ্রামের পাহাড় চূড়ায়প্রজ্ঞামিত্র বন বিহারেই দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে আয়োজন হয়ে আসছে স্বর্গপুরী উৎসব।
ধর্মসভায় সভাপতিত্ব করেন- চট্টগ্রামের চন্দনাইশ জামিজুরি সুমনাচার বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ শীলরক্ষিত মহাথেরো।
রামু প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের মহা-পরিচালক বিজয় রক্ষিত মহাথেরো ধর্মসভায় আশীর্বাদক এবং চট্টগ্রামের সুচিয়া সূখানন্দ বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ অতুলানন্দ মহাথেরো প্রধান ধর্মদেশকের বক্তৃতা করেন। প্রধান জ্ঞাতির ধর্মদেশনা করেন বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ, ভূবণশান্তি একশ ফুট সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধ মুর্তির প্রতিষ্ঠাতা করুণাশ্রী মহাথেরো। স্বাগত ও উদ্বোধকের ধর্মদেশনা করেন প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের অধ্যক্ষ শীলমিত্র থেরো।
সভায় বিশেষ অতিথির ধর্মদেশনা করেন- কক্সবাজার উ:কুশল্ল্যা বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ জ্ঞানপ্রিয় মহাথেরো, দীপঙ্কর মহাথেরো, শীলপ্রিয় থেরো, ধর্মানন্দ থেরো, ধর্মপ্রিয় থেরো, নিরোদানন্দ থেরো, প্রজ্ঞাসত্য ভিক্ষু, প্রজ্ঞা বিনয় ভিক্ষু, প্রজ্ঞাপাল ভিক্ষু, প্রজ্ঞাপ্রিয় ভিক্ষু প্রমুখ ভিক্ষুসংঘ।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন রামু জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন আহমদ প্রিন্স, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ক্যাছাই মং চাক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন চকরিয়া কেন্দ্রীয় জেতবন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞামোদিতা থেরো। পঞ্চশীল প্রার্থনা করেন কল্যাণ বড়ুয়া।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহার মাঠে তৈরি করা হয়েছে প্যাঁচঘর বা চক্রবাঁক। এ প্যাঁচঘরের ঠিক মাঝখানে বাশঁ, কাঠ, কাগজ ও নানা রঙের নানা কারুকাজে তৈরি করা হয়েছে দোতলা বিশিষ্ট কল্পিত স্বর্গ। সেই স্বর্গে আরোহন এবং ব্যুহচক্র প্রদক্ষিণেই চলছে এক অন্য ধরনের আনন্দ যজ্ঞ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বড়ুয়া, রাখাইন ছাড়াও অন্যান্য ধর্মের লোকজনকেও দেখা গেছে এ ব্যুহচক্র প্রদক্ষিণে। কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রাম থেকে আসা পূর্ণ্যার্থীরা সং সেজে, নানা বাদ্য বাজিয়ে নেচে গেয়ে উল্লাস করতে করতে প্যাঁচ ঘরের (ব্যুহচক্র) আঁকাবাঁকা পথ ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে আরোহণ করছে সেই কাঙ্খিত স্বর্গে। দোতলা এ স্বর্গ থেকে নেমে আবার ঘুরতে ঘুরতে চলে আসছে বাইরে। এ সময় ঢোলের তালে তালে গাইছে বুদ্ধকীর্তন ‘স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এল, বুদ্ধ বল বলরে, বুদ্ধের মতো দয়াল আর নাই রে’। সে যেন এক অন্য ধরনের উৎসব।







