বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক:
দেশে ফেসবুককেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বেড়েই চলেছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি, সাইবার হেল্পডেস্কসহ সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে অনলাইননির্ভর যত অভিযোগ আসে সেগুলোর মধ্যে ফেসবুক সংক্রান্ত অভিযোগের হার শতকরা ৭০-৭৫ ভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।
প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা দেশে ফেক বা ভুয়া আইডি খোলার হার বেড়ে যাওয়া, ফেক আইডি বন্ধ না করা, সমস্যার সমাধানে ফেক আইডির উৎস খুঁজে না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ফেসবুক আইডি খোলার সময় বয়সের প্রমাণপত্র’র ‘অপশন’ যুক্ত না করাকে।
ফেসবুক আইডি খুলতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্ম নিবন্ধন সনদ বা যে কোনও ধরনের ফটো আইডি বয়সের প্রমাণ হিসেবে যুক্ত করার সুযোগ থাকলে নিরাপদ থাকা যাবে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমে।
ফেসবুক ব্যবহারকারীর বয়স আসলে কত- ১৩, ১৬ নাকি ১৮? ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৩ বছরের নিচে কেউ ফেসবুক ব্যবহার করতে পারবে না। ইউরোপীয় কাউন্সিল প্রস্তাব করেছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীর বয়স ১৩-এর মধ্যে হওয়া উচিত। অন্যদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বলছে, ১৬ বছর। যদিও এই ১৬ বছর বয়স নিয়ে পার্লামেন্টে বিস্তর বাহাস হয়েছে কিন্তু ১৩ না ১৬, তা পাস হয়নি। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশেও তাই এ জাতীয় কোনও নিয়ম নেই।
আমাদের দেশে ফেসবুক ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনও বয়স নেই। ফেসবুকের ওই বেঁধে দেওয়া বয়সকেই নিয়ম বলে মানা হচ্ছে। তবে ঠিক কত বয়স হলে তা ঠিক ‘মানদণ্ড’ হবে, এমনটা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়নি।
এছাড়া ফেসবুকে আইডি খুলতে বয়সের কোনও প্রমাণপত্রও লাগে না। আইডি খোলার সময় বয়সের কোটা পেরিয়ে ওকে করলেই সব ঠিক। আইডি যিনি খুললেন আদৌ তার বয়স সঠিক কিনা তা যাচাই করেও দেখে না ফেসবুক। তবে যেসব দেশে ফেসবুকের নিজস্ব অফিস এবং অ্যাডমিন প্যানেল আছে সেসব দেশে ওই দেশের আইন অনুযায়ী ফেসবুক পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুক এ ধরনের কিছু চালুর উদ্যোগ নিলে দেশে তার প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যাবে। ফলে ব্যবসায় বা রাজস্বে একটা প্রভাব পড়বে। তাছাড়া তারা আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো ফেক বা ভুয়া আইডি খোলার সংখ্যা কম। কোনও কোনও দেশে একেবারে নেই বললেই চলে। আর ফেসবুক চলে তার বৈশ্বিক নীতিমালা অনুযায়ী। তবে যেসব দেশে তার অফিস রয়েছে সেসব দেশের কথা ভিন্ন । সেসব জায়গায় সামাজিক এই যোগাযোগ মাধ্যমটি স্থানীয় আইন মেনে চলে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এম রায়হান আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফেসবুক বয়সের প্রমাণপত্র সরাসরি চায় না এটা ঠিক, তবে পরোক্ষভাবে ঠিকই চায়। আইডি খোলার সময় যে মোবাইল নম্বরটি চায় সেটা দিয়ে তারা বোঝে যে এই নম্বরটি ‘ভ্যালিড’ এবং যিনি নম্বরটি ব্যবহার করেন তিনি ১৮ বছর বয়সী।
তিনি বলেন, ‘যদি সরাসরি প্রমাণপত্র চাইত তাহলে ফেসবুককেন্দ্রিক সমস্যা অনেকাংশে কমে যেত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ, বয়সের প্রমাণপত্র যুক্ত করার অপশন তৈরির করার সুযোগ কিন্তু ফেসবুকে রয়েছে। ফেসবুককে বলে এটা যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। মন্ত্রণালয় যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে কাজটি সহজে হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্ন উত্তর পর্বে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছিলেন, ফেসবুকের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করে সমঝোতা হয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সরকরের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিকারের বিষয়ে উত্তর পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৩১ জন ব্যবহারকারীর ১২টি তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এরমধ্যে ১৬.৬৭ ভাগ তথ্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সরকারকে দিয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তারানা হালিম সিঙ্গাপুরে ফেসবুক কার্যালয় পরিদর্শনে যান। ফিরে এসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফেসবুকের অ্যাডমিন স্থাপন করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বিভিন্ন স্থানে তাদের যে অ্যাডমিন আছে তা দিয়ে শুধু প্রতিদিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমরা যে চাহিদার কথা জানিয়েছি তাতে অ্যাডমিন স্থাপন না করেও তারা সহযোগিতা করতে পারবে বলে জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে অ্যাডমিন প্যানেল স্থাপনের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ফেসবুককে চিঠি দিয়েছিল। চিঠির উত্তরে ফেসবুক বাংলাদেশে তাদের অ্যাডমিন প্যানেল স্থাপনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে একাধিক শর্ত যুক্ত করে চিঠি দেয়। বিটিআরসিও কতগুলো শর্ত আরোপ করে ফিরতি চিঠি পাঠিয়েছিল ফেসবুককে। এরপরে আর বিষয়টি এগোয়নি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করলে ফেসবুকের সঙ্গে সমঝোতা হয়।
উল্লেখ্য, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এরই মধ্যে দুই কোটি পেরিয়ে গেছে। যদিও এরমধ্যে বেশিরভাগ আইডি ফেক বা ভুয়া।
চীনে ফেসবুক নিষিদ্ধ। তবে বিকল্প পথে ফেসবুকে প্রবেশ করা যায়। তবে চীনারা ভিপিএন ব্যবহার করে বিকল্প পথে ফেসবুকে প্রবেশে অনাগ্রহী জানা গেছে। বরং তারা তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাইদু ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফেসবুকের বিভিন্ন নিয়ম চীনাদের বেশ অপচ্ছন্দ। তারা ফেসবুক তাদের মতো করে ব্যবহার করতে আগ্রহী। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ চীনাদের সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এসবসহ ‘আরও অনেক কারণে’ চীনে ফেসবুক ততোটা সুবিধা করতে পারেনি বলে জানা যায়।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংস্কৃতিগত একটা পার্থক্য রয়েছে। আমেরিকায় বা ইউরোপে যেসব বিষয় স্বীকৃত, আমাদের দেশে সেসব বিষয় প্রচলিত না-ও হতে পারে। ওদের দেশে যা সর্বজন গ্রাহ্য আমাদের দেশে হয়তো তা পরিত্যাজ্য। এসব কারণে দেশভিত্তিতে ফেসবুকের একটা নীতিমালা থাকা উচিত। সব দেশের জন্য একই নীতিমালা (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) হওয়ায় প্রায়ই ফেসবুক নিয়ে সমস্যা হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, ফেসবুকের বাংলাদেশের জন্য একটা কাস্টমাইজড (নিজের প্রয়োজন মতো) নীতিমালা থাকা উচিত।
তিনি জানান, সম্প্রতি আইসিটি বিভাগের সঙ্গে ইউএনডিপির (জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি) কয়েকজন কর্মকর্তার এ বিষয়ে প্রাথমিক আলাপ হয়েছে। ফেসবুকের কাছে বাংলাদেশ থেকে একটি ‘কাস্টমাইজড’ প্রস্তাব যেতেও পারে বলে তিনি জানান।






