খালেদ শহীদ:
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেই রামু উপজেলা পরিষদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। রামু উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে ২০০৬ সালে বিএনপি’র আমলে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বর্তমান প্রতিকৃতি সংবিধান লংঘন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবসের প্রথম প্রহরে রামু উপজেলা পরিষদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান ছাত্র-শিক্ষক, সামাজিক-সংস্কৃতিক, সাংবাদিক নেতৃবন্দ সহ রাজনৈতিক নেতারা।
মহান ভাষা সংগ্রাম ও ভাষা শহীদদের ঐতিহ্য ইতিহাস আমাদের গর্বের ধন, স্মৃতি-শ্রদ্ধার প্রতিকৃতি শহীদ মিনার। বর্তমান রামু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশাকারী মহান ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস, ইতিবৃত্তকে বিকৃত করেছেন।
ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলে শহীদ বেদীতে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন, রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক তপন মল্লিক প্রমূখ।
এ শহীদ মিনার পরিবর্তন করে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে পুণনির্মাণের জোর দাবি জানান ভাষা শহীদদের স্মৃতি-শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিরাও।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে আসে স্কুল ছাত্র সারওয়াত ওবাইদ ওয়াফী, রাজর্ষি বড়ুয়া, অভ্র বড়ুয়া, শুভাশীষ বড়ুয়া অর্ঘ্য সহ শত শত ছাত্রছাত্রী।
তারা বলে, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান শহীদ দিবস। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসহ সাধারণ মানুষ শহীদ হয়েছেন ১৯৫২ সালের এ দিনে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। পাকিস্তানের শাসকরা চেয়েছিল উর্দুকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা করতে। বাংলার জনগণ তা মেনে নেয়নি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। ভাষার দাবিতে অনুষ্ঠিত ওই মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে। ভাষার দাবিতে এমন আত্মদান পৃথিবীতে বিরল একটি ঘটনা।
ভাষা শহীদ স্মরণে ঢাকায় তৈরি হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ রকম ছোটবড় শহীদ মিনার রয়েছে। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। আমাদের পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। শিক্ষকরা বই’র ছবি দেখিয়ে আমাদের বলেছিলেন, এটি শহীদ মিনার। ভাষা শহীদদের স্মৃতি-শ্রদ্ধার প্রতীক।
রামুর এই শহীদ মিনারটি বইয়ের শহীদ মিনারের মত নয় কেন? এ প্রশ্ন ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসা রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সাঈদ হাসান, সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র মোবারক হোসেন, মামুনুর রশিদ, নাহিদুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, তানজিন মোহাম্মদ, ষষ্ঠ শ্রেণীর রিফাত হোসেন সহ আরো শত শত শিক্ষার্থীর।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে আছে, রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলা সমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।
২৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমন্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।
ইতিহাস বিকৃতির কথা বলে সমস্বর নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া বলেন, শহীদ মিনার বাঙলা ভাষা, স্বাধীনতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ সর্বোপরি বাঙালির জাতীয় পরিচিতির প্রতীক। সারাদেশে এ প্রতীক অবশ্যই এক ও অভিন্ন হওয়া উচিত; ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মত। তবে স্থান অনুসারে ছোট-বড় হতে পারে। নয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে অভিন্ন জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় পরিচিতি বিকৃতরূপে দেখা দেবে। সত্যি বলতে কি, রামু উপজেলা পরিষদের শহীদ মিনারটি স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট একটি বিকৃত শহীদ মিনার। এতাদিনেও কেন কর্তৃপক্ষ এটি ভেঙ্গে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে পুননির্মাণের পদক্ষেপ নিলেন না জানিনা। আমরা অনেক আগে থেকেই এটি ভেঙে নতুন করে গড়ার দাবি জানিয়ে আসছি।
রামু উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া জানান, এ শহীদ মিনারটি তৎকালিন বিএনপি’র সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মো. শহীদুজ্জামান নিজের খেয়াল খুশিমত নির্মাণ করিয়েছেন। ওই সময় থেকেই আমরা এর পরিবর্তন করে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মাণ করার দাবি জানিয়ে আসছি। তিনি আরো বলেন, যেদিন শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করা হয়, ওই সময় সাংসদ নিজে সহ অন্যান্যরা জুতা পায়ে উঠে পবিত্রতা নষ্ট করেছেন। উদ্বোধনের নামে আয়োজন করেছিলেন, উচ্ছৃংখল গানবাজনা। ফলে শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা ওই দিনই ক্ষুন্ন হয়েছে। ইতিহাস বিকৃত এ শহীদ মিনারটিতে ভাষা শহীদদের স্মৃতি-শ্রদ্ধার প্রতীক ছিলনা বলেই তারা এটি করতে পেরেছিলেন।
রামু উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি ধনীরাম বড়ুয়া বলেন, মনগড়া একটি একটি নকশা করে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ইল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ফ্রান্স, ইতালি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তৈরী শহীদ মিনার আমাদের ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু রামু উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গনে তৈরী শহীদ মিনারটির ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সাথে সামান্যতমও মিল নাই। এটিকে পরিবর্তন করতে হবে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি ও ইতিহাস আমাদের ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়ের বইয়ের মাঝে খুঁজে পায়।
এ ব্যাপারে রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহা. শাজাহান আলী আমাদের রামু কে বলেন, ইতিহাস বিকৃতির কথা বলে অনেকে প্রস্তাব করেছেন শহীদ মিনারটি পরিবর্তন করে, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে পুননির্মাণ করার। ছাত্রছাত্রীরা যেরূপ শহীদ মিনারের কথা পাঠ্যবইয়ে পড়ে-দেখে সেরূপ শহীদ মিনার নির্মিত হোক আমিও চাই। তিনি বলেন, স্থানীয় সাংসদ আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল উপজেলার মাষ্টার প্ল্যানে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলেই রামু উপজেলা পরিষদের শহীদ মিনারটি নির্মাণের উপর জোর দিয়েছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী মাসুদ আল মামুন আমাদের রামু কে বলেন, উপজেলার মাষ্টার প্ল্যানের খসড়া করা হয়েছে। সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের প্রস্তাবে উপজেলা পরিষদস্থ শহীদ মিনারটি থাকবে এ মাষ্টার প্ল্যানে। নতুন ভাবে নির্মিত শহীদ মিনারটি অবশ্যই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে হবে।
রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম আমাদের রামু কে বলেন, ভাষা শহীদদের স্মৃতি প্রতিকৃতি উপস্থাপন করে নির্মিত হয়নি শহীদ মিনারটি। শহীদ মিনার নির্মাণ করার আগে ইতিহাস, ঐতিহাসিক তাৎপর্য, শহীদ মিনারের মর্যাদা, ভাবগাম্ভির্যতা ও পবিত্রতা সংরক্ষণের দায়-দায়িত্বকে তোয়াক্কা করা হয়নি। ইতিহাস বিকৃতভাবে নির্মাণ হওয়ায় শহীদ মিনারটি পরিবর্তনের দাবি উঠা প্রাসঙ্গিক। ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে ভাবতাৎপর্য ও ইতিহাস ধারণ করেই রামু উপজেলা পরিষদের শহীদ মিনারটি পুণনির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী একুশের আগেই এ শহীদ মিনারটি পুননির্মাণ করা হবে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, মাতা-মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতীক শহীদ মিনার। মধ্যখানের স্তম্ভটি মায়ের প্রতীক। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মায়ের ভাষার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়া শহীদ সন্তানদের প্রতীক চারটি স্তম্ভ¢। মা একটু ঝুঁকে তার শহীদ সন্তানদের দোয়া করছেন। শহীদ মিনারের প্রতীক ও প্রতিকৃতি বাঙালির মনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, তা হয়ে ওঠে যথার্থই বাঙালির স্মৃতির মিনার। সাতান্ন থেকে একাত্তর সাল চৌদ্দটি বছর ঐ চেতনাই ছিল শহীদ মিনারের রূপকল্প। যা শিল্পী হামিদুর রহমানের সাতান্ন সালের শহীদ মিনারে প্রথম প্রতিফলিত হয়েছিল, যা আংশিকভাবে হলেও তেষট্টি সালে সমাপ্ত শহীদ মিনারে উপস্থিত ছিল। বাহাত্তর সালে নতুনভাবে নকশা করতে গিয়ে হামিদুর রহমান সে চেতনাকে অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। মাতা এবং সন্তানের প্রতীক স্তম্ভ নিয়ে গড়ে ওঠা শহীদ মিনার, এ দেশের মানুষের চেতনায় স্থায়ী আসন নিয়েছিল। শিল্পী হামিদুর রহমানের সাতান্ন সালের পরিকল্পনাতে শহীদ মিনারের স্তম্ভ¢গুলি মাতা ও সন্তানের প্রতীক, অর্ধবৃত্তাকারে মাতা তার শহীদ সন্তানদের অনন্তকাল ধরে রক্ষা করছেন, যারা তাঁর মর্যাদা রক্ষার জন্যে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আর সেই জন্য গৌরবান্বিত মা তাদের দোয়া করছেন। সন্তানদের আত্মত্যাগের মহিমায় মা ঝুঁকে পড়েছেন একটু স্নেহে। আর চারটি সন্তানের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর লক্ষ কোটি সন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে বাংলাদেশের শহর-গ্রামে গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। সারা বিশ্বে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মিত হয়েছে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিনার।
রামু প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুনীল বড়ুয়া বলেন, শিল্পী হামিদুর রহমান ও স্থপতি এম. এস. জাফরের নকশা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরী হয় বালাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আমাদের জাতিসত্বার ঐতিহ্য ইতিহাসের অর্থবহ যে শহীদ মিনার কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার সামান্য চিহ্নও রামু উপজেলা পরিষদের শহীদ মিনারে ফুটে উঠে নাই। এ জন্য রামুর এ শহীদ মিনারটি বিকৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। শহীদ মিনার এখন বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের যেখানেই বাংলা ভাষাভাষীরা আছেন, সেখানেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে গৌরবের শহীদ মিনার। বিশ্বের আর কোনো সাংস্কৃতিক প্রতীকের এত ব্যাপ্তি আর মর্যাদা রয়েছে বলে মনে হয় না।






