ক্ষমতায় থেকে চার বছর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার গণভবনে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি বলেন, “২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। অবশ্যই আমাদের সামনে লক্ষ্য, এই সুবর্ণজয়ন্তী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে উদযাপন করবে, দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করবে।”
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ। তাতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের ‘ডিজিটাল দেশে’ পরিণত করার অঙ্গীকার করা হয়।
ওই বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এরপর বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
শেখ হাসিনা বলেন, তার দলের সুনির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র ও দেশের উন্নয়নে অর্থনৈতিক নীতিমালা থাকায় তারা পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কাজ করেছেন। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে, যা ইতোমধ্যেই দেশকে ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি’ এনে দিয়েছে এবং নিম্নআয়ের থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন হবে। আমি চাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেই এই জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন আমরা করব। তখন বাংলাদেশ ঠিকই জাতির জনকের স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হবে।”
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য যেসব লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করেছিলেন তার অনেকগুলো ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করে ফেলেছেন।
“কিন্তু ‘বড় বড়’ যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নত দেশের মহাসড়কে যাত্রা শুরু করবে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আরও একবার ক্ষমতায় আসা দরকার।
“আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এদেশের জনগণের উন্নয়ন হবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ২০০৮ এ যেটা শুরু করেছি, ২০১৪ তে আমরা আসতে পেরেছি বলে সেটা অব্যাহত আছে।
“আমরা যে বড় বড় প্রকল্পগুলো নিয়েছি সেগুলো বাস্তবায়ন করতে আমাদের আরও এক টার্ম প্রয়োজন। তাহলেই আমরা সেটা সম্পূর্ণ করতে পারব। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে পারব। ইনশাল্লাহ ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশ হব।”
২০১৯ সালের শুরুতেই বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। তার আগেই নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচন সাংবিধানিক অধিকার, সেটা অব্যাহত থাকবে। সেই অধিকারের মাধ্যমে দেশের মানুষ যাকে ভোট দেবে তারাই আসবে।
“আমরা দেখতে পাচ্ছি, নির্বাচন আসলেই বিএনপি টালবাহানা শুরু করে। ২০১৪ সালে তারা নির্বাচনে যায়নি এটা তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু জনগণ যাতে ভোট দিতে না পারে সেজন্য জনগণকে হত্যা করেছিল। তারা স্কুল পুড়িয়েছিল, মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জনগণ তা ভুলে যায়নি, সেটা ভুলে যাবেন না।”
বিএনপিকে নিয়ে তিনি বলেন, “এদের ক্ষমতায় থাকার সময় লুটপাট, দুর্নীতি নিশ্চয়ই জনগণ ভুলে যায়নি। জনগণের কাছে সেই তথ্যগুলি তুলে ধরতে হবে।
“সেদিকে লক্ষ্য রেখে রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের কর্তব্য জনগণের মধ্যে একটা সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। জনগণকে সচেতন করতে হবে যে, এরা দেশ শাসন করতে আসে না। এরা ভোগ করতে আসে, দুঃশাসন চালায়, এরা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন করে। এরা লুটপাট করে, দুর্নীতি করে তারা আর্থিকভাবে ধনী হয়- এটাই বাস্তবতা।”
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, “জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বলা হয়েছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও দুই ছেলের জন্য সম্পদ রয়েছে ভাঙা সুটকেস ও ছেড়া গেঞ্জি।
“ভাঙা সুটকেস, ছেড়া গেঞ্জির নমুনা তো দেখছি। ভাঙা সুটকেস আর ছেড়া গেঞ্জি থেকে কত ইন্ডাস্ট্রিজ, শত শত কোটি টাকার মালিক, এত সম্পদের পাহাড় কোথা থেকে আসল?
“যদি বলে ভাঙা সুটকেস যাদুর বাক্স হয়ে গিয়েছিল, জাদুর বাক্স থেকে বেরিয়েছে তাহলে কিছু বলার নেই। কিন্তু এটা জনগণের অর্থ থেকে লুটপাট করা। এটা বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে ভুলবে?”
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের অর্থপাচারের মামলায় সাজা হওয়ার কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। খালেদার আরেক ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমানের কোকোর পাচার করা অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে ফিরিয়ে আনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললে তারা তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন, যা প্রমাণ করতে পারেনি বিশ্ব ব্যাংক। “কিন্তু খালেদা জিয়ার শাসনামলে বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন প্রকল্প দুর্নীতির অভিযোগে বন্ধ করে দিলে খালেদা জিয়া তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পারেননি।”
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে হত্যা-ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় বসানো হয়।
“এরপর ক্ষমতাসীনরা তাদের বিত্তবৈভব বাড়ান। তাদের শাসনকে পোক্ত করতে দেশে একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করা হয়।”
জিয়াউর রহমানের শাসনামল এবং ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিল তা জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমাতে কাজ করছে।
“উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের চাহিদাও পাল্টে গেছে। গ্রামেও এখন বিউটি পার্লার এসে গেছে। গ্রামেও জিমনেসিয়াম ও ফিজিওথেরাপি সেন্টারের চাহিদা তৈরি হয়েছে।”
বিদ্যুৎ ও কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তির প্রসার, ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং আট হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
“এখন কাজের এত সুযোগ যে কেউ ইচ্ছে করলেই কিছু না কিছু করে খেতে পারে, সে ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে লক্ষ্য তার বাবা ছিল, সেটা সামনে আছে বলেই তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন।
“এখানে আমরা কী পেলাম আর না পেলাম সে চিন্তা আমরা করি না। দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করে যেতে পারলাম সেটাই আমার চিন্তা। দেশের মানুষকে কী দিয়ে যেতে পারলাম সেটাই আমার চিন্তা।
“বাংলাদেশের জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কাকে চায়।”
দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্ট বিডিনিউজের।






