:
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন শুরু করে। আর তখন থেকেই প্রতিবছর ৯ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এদিন বিশ্বের ৩৭ কোটিরও বেশি আদিবাসী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এদিন যেমন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে উদযাপন করা হয়, তেমনি পৃথিবীতে তাদের অবদানকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অধিকার আদায়ের জন্য আদিবাসী মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামকে যেমন স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই সংগ্রমের ওপর আলোকপাত করা হয়। আদিবাসী জনগণের অধিকার ও পরিচয়কে সুরক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে অঙ্গীকার করেছিল, এদিন তাদের সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবছর এদিনে আদিবাসীদের কোনো একটি ব্যাপারে বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘শিক্ষাক্ষেত্রে আদিবাসীদের অধিকার’।

বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগণ সাত হাজার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষায় কথা বলে এবং পাঁচ হাজারের অধিক ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। যদিও তাদের সংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশেরও কম; বিশ্বের দরিদ্রতম জনসংখ্যার ১৫ শতাংশই আদিবাসী। বিশ্বের বহু জায়গায় আদিবাসীরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, তাদের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, ভাষা ও অস্তিত্বের মতো বিষয়গুলো নিজ সরকার এবং সহ-নাগরিকদের দ্বারা স্বীকৃত, সম্মানিত ও উৎকর্ষসাধন হচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত করতে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো এখনো সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার সাধারণভাবে জাতীয় গড় মানের তুলনায় অনেক কম। এর মূল কারণ হলো জাতিগত সংখ্যালঘুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগের স্বল্পতা, ভাষাগত বাধা, সম্পদের অপ্রতুলতা, সহপাঠী ও শিক্ষকদের কুসংস্কারকমূলক আচরণ এবং নৃতাত্ত্বিক সংখালঘু হওয়া লজ্জাকর—সামগ্রিকভাবে এমন মনোভাব বজায় থাকা।

গত বছর বিশ্বনেতারা টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেন। এই ২০৩০ এজেন্ডা আদিবাসী সম্প্রদায়সহ সব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সুযোগ এনে দেয়। এই ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউকে পেছনে না ফেলে এগিয়ে চলা, যা আদিবাসীদের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টেকসই উন্নয়নের বেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রায় আদিবাসীদের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তার মধ্যে হলো একটি লক্ষ্যমাত্রা ৪, যেটিতে আদিবাসী শিশুদের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একইভাবে, আরও কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রায় আদিবাসীদের জীবনের কিছু নির্দিষ্ট বিশেষ বিষয়, যেমন ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদন থেকে আয় ও সমষ্টিগত ভূমি অধিকার ইত্যাদি তুলে ধরে।
বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের নেতৃত্ব নিজ উদ্যোগেই গ্রহণ করেছে এবং ২০৩০ এজেন্ডা ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। এই প্রচেষ্টা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ আদিবাসী ও উপজাতি মানুষের বসবাস, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ। তাদের অধিকার সমুন্নত রাখার সরকারি প্রচেষ্টার ফলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয়, যা নতুন সপ্তম জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী ও উপজাতি সম্প্রদায়ের শিক্ষাসংক্রান্ত উন্নয়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশে জাতিগত সংখ্যালঘু শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ছয়টি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এই ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে আদিবাসী ও উপজাতীয় গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, জ্ঞান ও অস্তিত্ব যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি তাদের সম্মানও দেখানো হবে। এটি শিক্ষা খাতে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার যথার্থ উদ্যোগ। কেননা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এটি চিহ্নিত করা হয়েছে যে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামের শুধু ৭ দশমিক ৮ শতাংশ জনগণ প্রাথমিক শিক্ষা এবং ২ দশমিক ৪ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষা পেয়েছে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা সেবা আরও বিস্তৃত করার ব্যাপারে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় এটাও স্বীকার করা হয়েছে যে ভূমি সমস্যা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পরিকল্পনায় আদিবাসী ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে দারিদ্র্য উত্তরণে এবং ভাষা ও শিক্ষার অধিকারসহ কয়েকটি মূল উদ্বেগ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো সমাধানে সক্রিয় উদ্যোগ আহ্বান করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এ বছর মে মাসে অনুষ্ঠিত আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম আদিবাসীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি ও তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই ফোরামে বলা হয়, শিক্ষার সুযোগ আদিবাসীদের সম্পদ, স্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য ভোগ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হবে। এই প্রেক্ষাপটে, আদিবাসী ও উপজাতি সম্প্রদায়গুলো যেন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জনে তাদের পূর্ণ অবদান করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের সংস্থা, তহবিল ও কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে।
************************************************************************************************
লেখক: রবার্ট ডি ওয়াটকিন্স: আবাসিক সমন্বয়কারী, জাতিসংঘ বাংলাদেশ।
সূত্র: প্রথম আলো







