হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী :
ভাঙ্গা সড়ক, খানা-খন্দক আর ভঙ্গুরতার কারণে প্রতিদিনই নাজেহাল হচ্ছেন কক্সবাজার সদর, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অধিবাসী ও পথচারীরা। অন্যতম ব্যস্ত ও বাণিজ্যিক এলাকার ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের এই বেহাল দেখলে যে কেউ বলবেন কতোটা অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে সড়কটি। বর্ষায় নোংরা কাদা-পানিতে ভোগান্তির মাত্রা বেড়ে যায় আরও কয়েকগুণ। ২১ কিলোমিটার বিশিষ্ট এ সড়ক এখন লাখো মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র মতে, কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও বাস স্টেশনের উত্তর পাশ দিয়ে ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী নদীর তীর হয়ে ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের শুরু। এখান থেকে রামু উপজেলার পাহাড়ি ইউনিয়ন ঈদগড় বাজার পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার।
ঈদগড় বাজার থেকে নাইক্ষংছড়ির বাইশারী বাজার পর্যন্ত দৈর্ঘ্য আরো ১১ কিলোমিটার। কিন্তু পুরো সড়কটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় পড়লেও সড়কের ঈদগাঁও স্টেশন থেকে ভোমরিয়াঘোনা ফরেস্ট অফিস পর্যন্ত অংশটি ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ, গজালিয়া থেকে ঈদগড়ের ঢালা পর্যন্ত অংশ ইসলামাবাদ ইউপির আর এ ঢালা থেকে ছগিরাকাটা-ব্যাঙডেবার মুখ পর্যন্ত ঈদগড় ইউপির এবং বাকি প্রায় ৩ কিলোমিটার পড়ে বাইশারী ইউনিয়নের আওতায়।
তাই একেক সময় একেক ইউনিয়ন তাদের নিজ নিজ অংশটি মেরামত কিংবা সংস্কার করায় সড়কের কোনো না কোনো অংশ প্রায় সময় খানা খন্দকে ভরা থাকে। তাই পুরো বছরই ভোগান্তি পোহান যাতায়তকারীরা।
ঈদগাঁও ইউপির ভোমরিয়াঘোনা এলাকার সদস্য আবদুল হাকিম ও স্থানীয় সমাজকর্মী মোস্তফা কামাল বলেন, টানা কয়েক বছর পাহাড়ি ঢলের মাত্রা বেড়ে ভাঙনের কবলে পড়ে পুরো সড়কটিই চলাচল অযোগ্য হয়ে আছে। ভোমরিয়াঘোনাসহ বেশ কয়েকটি অংশ ভাঙনের কবলে পড়েছে। কিছু অংশ নদীতে বিলীন প্রায়।
এরপরও ভোগান্তি ও ঝুঁকি নিয়ে জন ও যান চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এ সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা পাহাড়ি ঢালায় নির্বিঘ্নে যানবাহন ডাকাতি ও সুযোগ বুঝে অপহরণ করছে। আগে এসব করতে গেলে গাড়ির গতি থামাতে সড়কে ব্যারিকেট দেয়ার দরকার পড়তো। কিন্তু এখন গর্তের কারণে কচ্ছপ গতিতে গাড়ি চালাতে হয়।
বাইশারী ইউনিয়নের হাফেজ আতাউল্লাহ জানান, খানা-খন্দকের কারণে নিয়মের দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে হলেও দিনের বেলা গাড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর তারও অতিরিক্ত ভাড়া দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোনো যানবাহনকে ঈদগড়-বাইশারী যাওয়া কিংবা ঈদগাঁও আসার জন্য রাজি করানো যায় না।
বাইশারীর সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন ও ঈদগড় সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি মুফিজুর রহমান বলেন, চালকরা যাত্রীসেবা দিতে পারলেই খুশি হয়। কিন্তু ভঙ্গুর রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির লাইফ দ্রুত কমতে থাকে। সম্প্রতি পানেরছড়া ঢালায় গর্তে পড়ে লেদু নামে এক চালকের সিএনজির সেফ ভেঙে গেছে। যা রাতের বেলা আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই স্থলপথ হলেও সন্ধ্যার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে বাধ্য হই আমরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা য্য়া, সড়কের ঈদগাঁও পালপাড়া থেকে শুরু হয়েছে সড়কের মাঝে ছোট-বড়-মাঝারি গর্তের। যা রয়েছে চৌধুরীপাড়া এবং ভোমরিয়াঘোনায়। এখানে হাজি শফিক দাখিল মাদরাসার রাস্তার মাথায় ৫০ ফিটের মতো ছরা হয়ে আছে। এটি পারাপারে ব্যবহার করা হয়েছে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো।
এরপর কিলো দেড়েক রাস্তা কিছুটা সমান্তরাল থাকলেও ফরেস্ট অফিস থেকে আবারো শুরু হয়েছে খানাখন্দ। এটি অব্যাহত রয়েছে ঈদগড়ের হাসনাকাটা পর্যন্ত। এখান থেকে বাজারের কিছু অংশ পর্যন্ত কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারলেও বাজারের মাঝখান থেকে আবার সেই খানাখন্দ ও গর্ত শুরু হয়ে শেষ হয়েছে একেবারে বাইশারী বাজার সীমান্তে গিয়ে। তবে হিমছড়ি ঢালা, ছগিরাকাটা, বৈদ্যপাড়া, পাইন্যাশিয়াঘোনা, হাজিপাড়া অংশের সড়কসহ বেশ কয়েকটি কালভার্ট চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বলেন, পাহাড়ে উৎপাদিত বাণিজ্যিক পণ্য থেকে টোল আদায়ের লক্ষ্যে বাইশারী, ঈদগড় ও ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ সড়কটির নিজ নিজ অংশ ইজারা দিয়ে প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব আয় করে। সে টাকা দিয়েও প্রতি বছর সংস্কার অব্যাহত রাখলে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
বাইশারীর স্বাস্থ্য সহকারী জহির উদ্দিন বলেন, সড়কের অবস্থা এতোটায় বাজে কোনো গর্ভবতী দূরে থাক সাধারণ মানুষও সড়ক দিয়ে যাতায়াতে ভয় পায়। সড়ক পাড়ি দিতে গিয়ে গাড়ির ঝাঁকুনিতে অথবা আঘাত পেয়ে সব যাত্রী কম বেশি আহত কিংবা অসুস্থ হচ্ছেন।
ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে সড়কটির বেহালদশা দেখে আসছি। তাই দায়িত্ব নেয়ার পর পরই এলজিইডিতে যোগাযোগ করেছি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটি মেরামতে টেন্ডার হয়ে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় কবে আসবে বলা মুশকিল।
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি বাইশারীতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সড়কটির বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কারণ সড়কের দুরাবস্থার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম ছিদ্দিকী সড়কটির দুরাবস্থার কথা স্বীকার করেেআমাদের রামু কে বলেন, ২০১৫ সালেই সড়কের ১০ কিলোমিটার অংশ সংস্কারে ৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বান্দরবানের ভূইয়া কনেস্ট্রাকশন কাজটি পায়। পরবর্তীতে আবারো বন্যার কবলে পড়ে ভাঙন স্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয় বেড়ে যায়। তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর কাজ আরম্ভ করেনি। পরবর্তীতে আরো ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ মঞ্জুর করে কাজের পরিধি বাড়ানো হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে আর কাজ করা হয়ে উঠছে না। যত দ্রুত সম্ভব কাজটি সম্পন্ন করে এ অঞ্চলের মানুষকে ভোগান্তি মুক্ত করতে আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।






