আগামী ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করতে সরকারের অভিমত জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে মূলত তিনটি মাসকে টার্গেট করছে নাসির উদ্দীন কমিশন। এখন এই তিনটি মাসের বিষয়ে সরকারকে অবগত করবে কমিশন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি জানিয়েছেন, এ বছর ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।
প্রধান উপদেষ্টার এই প্রয়াসকে প্রাধান্য দিয়ে ইতোমধ্যেই সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে নির্বাচনের জন্য ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করলে বর্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়ে আগামী রমজানের আগেই নির্বাচন চেয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াত ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এ বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। তার (প্রধান উপদেষ্টা) কমিটমেন্টে তিনি ঠিক আছেন কি না, আমরা সেটা দেখতে চাই। তবে আমাদের ভিউ হচ্ছে, এটা (নির্বাচন) রমজানের আগেই শেষ করতে হবে। জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করলে বর্ষা, বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবে, তখন আবার ইলেকশনটা (নির্বাচন) অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। সে জন্য আমরা চাইছি, ওই আশঙ্কার আগেই যেন নির্বাচন হয়ে যায়।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে দিতেই হবে।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ, এম, এ, নাসির উদ্দীন ইতোমধ্যেই বলেছেন, ঐকমত্য কমিশনের সংস্কারের দিকে তাকিয়ে থাকবে না নির্বাচন কমিশন। নিজেদের ক্ষমতার মধ্যে যা যা আছে তা নিয়ে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। রাজনৈতিক বিষয়ে উদ্যোগ নেবে ঐক্যমত কমিশন। সে নিয়ে কথা বলতে চায় না ইসি। তবে ভোটের প্রস্তুতিতে নির্বাচনের আগে যা যা করা দরকার নিজেদের ক্ষমতাবলে সেসব কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
সিইসি জানান, নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কেনাকাটার কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সীমানা নির্ধারণে আইন পরিবর্তন দরকার। আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং হয়ে আসলে কাজ শুরু হবে সীমানা নির্ধারণ নিয়ে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের আবেদনেরও সময় বাড়ানো হয়েছে। মূলত নির্বাচনের প্রস্তুতিতে পুরো দমে কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না পেলেও সংসদ নির্বাচন নিয়ে পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে যাচাই-বাছাই করে কমিশনকে রিপোর্ট দিয়েছে কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখা।
প্রতিবেদন তৈরির কাজে জড়িত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিশন জানতে চেয়েছে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত কোন মাসে কী কী ইভেন্ট আছে। কোন মাসে ভোট আয়োজন হলে সুবিধা-অসুবিধা কী কী?
তিনি জানান, ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত প্রত্যেকটি মাসের সুবিধা-অসুবিধা জানিয়েছে সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা। ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি সুবিধাজনক সময় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্চে রোজা ও ঈদ, এপ্রিলে পরীক্ষা, পরের দুই মাস বৃষ্টি, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ সময় হওয়ার কারণে মধ্য ফেব্রুয়ারির পর নির্বাচন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে ঘূর্ণিঝড়টা বেশি থাকে। এছাড়া জুন মাসের প্রথম দিকেও এই সম্ভবনা থাকে। তবে জুন মাসে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার সাথে সাথে বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে। এর মধ্যে বৃষ্টিপাত বেশি হলে এই তিন মাসের মধ্যে ফ্ল্যাশ আকারে বন্যা হয়। মূলত এই তিন মাস বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আওতায় থাকে বলে জানান তিনি।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সবকিছু নির্ভর করবে সদিচ্ছার ওপর। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি নির্বাচন চান নাকি চান না। যদি না চান তাহলে হাজারটা অজুহাত দাঁড় করাতে পারবেন। রোজার মধ্যে যুদ্ধও করা যায়। আর ভোটটা তো একদিনের বিষয়, একদিনেই শেষ।
তিনি বলেন, আমি দেখলাম নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে। এখন ফাইনালি ঐকমত্য কমিশন কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটার ওপর নির্ভর করছে। এ ছাড়া গণভোটেরও প্রয়োজন হতে পারে।
নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ আরও বলেন, এখানে আরেকটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের গুরুত্ব রয়েছে। দলগুলো এখনও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে মাঠের রাজনীতির প্রধান দল বিএনপি বিদ্যমান ব্যবস্থা অটুট রাখতে চায়। আবার জামায়াত ইসলামী চাচ্ছে ভিন্ন ব্যবস্থা। এখন নির্বাচন পদ্ধতি যদি নিশ্চিত করা না যায় বা ঐক্যমত্যে না পৌঁছায় তাহলে তো মুশকিল হয়ে যাবে। বিষয়টা সহজ-সরল নয়, পুরো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফেলতে হবে। সবকিছু বিবেচনায় না নিয়ে সরল অংকের মতো যদি নির্বাচন কমিশন কারও প্রেসক্রিপশনে যায়, তাহলে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
কোন মাসে নির্বাচন করলে সবচেয়ে ভালো হবে— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের সবচেয়ে সুইটেবল সময় নভেম্বরে। এই সময় শীত থাকলেও তুলনামূলক কম থাকে। বৃষ্টির কোনো সম্ভবনা নেই। নানা কারণে নভেম্বর হবে সবচেয়ে সহায়ক সময়। এখন যারা সরকারে আছে, তারা যদি সরকারে থাকাটাকে লাভজনক মনে করে তাহলে তো তারা নির্বাচন চাইবে না। এখন আমরা যদি এই সত্য কথাটা না বলি, তাহলে আমাদেরও দায় নিতে হবে। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভোট করতে চাইলে জানুয়ারি হবে সবচেয়ে ভালো সময়।
ঢাকা পোস্ট







