আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা স্বাস্থ্যকর খাবার খান, ব্যায়াম করেন, মেডিটেশন করেন, কিন্তু তারপরেও তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এর কারণ হলো তারা বেশিরভাগ সময় স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করেন, স্বাস্থ্যকর সকালের নাস্তা দিয়ে দিন শুরু করা। সকালে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যগত সুবিধা দেয়।
যে ৫ ভুলে সকালের নাস্তা থেকে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়
আপনি সকালের নাস্তায় যা খান তা আপনার শক্তির মাত্রা এবং রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে মনে করেন তাদের সকালের নাস্তা স্বাস্থ্যকর, কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না যে এতে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং অতিরিক্ত চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। সকালের নাস্তার পাঁচটি সাধারণ ভুল সম্পর্কে জেনে নিন, যা আপনার অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত-
১. চিনিযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া
মিষ্টি সিরিয়াল, ফ্লেভারযুক্ত দই, পেস্ট্রি, বিস্কুট এবং মিষ্টি চা/কফি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় বলে দেখা গেছে। চিনি ছাড়া খাবার বেছে নেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে মিষ্টির জন্য ফল ব্যবহার করা উচিত।
২. সরাসরি কার্বোহাইড্রেট খাওয়া
টোস্ট বা ইডলি দিয়ে সকালের নাস্তা করলে মানুষের ক্ষুধা পেতে পারে। এই ধরনের খাবারের সঙ্গে ডিম বা দইয়ের মতো প্রোটিন মিশিয়ে খাওয়া একটি ভালো উপায়।
৩. খুব ঘন ঘন ময়দার খাবার খাওয়া
সাদা রুটি এবং সাদা ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার বিপাকীয়ভাবে হজমযোগ্য। আস্ত গম, ওটস, মিলেট এবং অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৪. খাওয়ার পরিবর্তে পান করা
ফলের রস, মিষ্টি পানীয় এবং কিছু স্মুদিতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ খুব বেশি থাকে। এগুলো একটি গোটা ফলের মতো পেট ভরাতেও পারে না। তাই গোটা ফল এবং চিনি ছাড়া পানীয় খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৫. খাবারের পরিমাণ
অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে স্বাস্থ্যকর খাবারও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। সকালের নাস্তায় প্রোটিন, আঁশযুক্ত উপাদান যেমন শস্য, শাক-সবজি ও ফল, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং উপযুক্ত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকা উচিত।
এখানে মূল উদ্দেশ্য সকালের নাস্তায় কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রোটিন ও আঁশের সঙ্গে কার্বোহাইড্রেট অন্তর্ভুক্ত করা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া এবং এর ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভব করা।
সকালের নাস্তা কীভাবে রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব ফেলে
অ্যাডভান্সেস ইন নিউট্রিশন জার্নালে প্রকাশিত ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় অনুসন্ধান করা হয়েছে যে, সকালের নাস্তা খাওয়া এবং কী ধরনের খাবার বেছে নিচ্ছেন তা কীভাবে রক্তে শর্করার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে, সকালের নাস্তা বাদ দেওয়ার সাথে ওজন বৃদ্ধি, মেটাবলিক সিনড্রোম এবং ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।
সকালের খাবার বাদ দিলে শরীরে ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য বেড়ে যায়, যা দিনের পরবর্তী সময়ে আপনাকে ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, সকালের নাস্তা খেলে তা সারাদিন ধরে গ্লুকোজ এবং ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আপনার শরীরের ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।
আমাদের দৈনন্দিন হরমোনের ছন্দের কারণে, সকালে আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই কার্বোহাইড্রেট ভালোভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, অল্প পরিমাণে সকালের নাস্তা এবং বেশি পরিমাণে রাতের খাবার খাওয়ার তুলনায়, বেশি পরিমাণে উচ্চ-শক্তির সকালের নাস্তা এবং তারপরে অল্প পরিমাণে রাতের খাবার খেলে তা খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিকে কমিয়ে আনতে পারে। তবে আপনি সকালের নাস্তা আদৌ খাচ্ছেন কি না, তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কী খাচ্ছেন।
সকালের নাস্তায় দ্রুত শোষিত হয় এমন কার্বোহাইড্রেট, যেমন চিনিযুক্ত পেস্ট্রি বা সাদা পাউরুটি থাকলে তা আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এই দ্রুত শোষিত হওয়া কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, হোল গ্রেইন এবং ফাইবার গ্রহণ করলে শর্করার শোষণ ধীর হয়ে যায়। এটি আপনার গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে পারে। গবেষণাটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আঁশ ও শস্যদানা সমৃদ্ধ সকালের খাবার গ্রহণ করা এবং দ্রুত হজমযোগ্য চিনি এড়িয়ে চলা দীর্ঘমেয়াদী রক্তে শর্করার স্বাস্থ্য রক্ষার একটি ভালো উপায়।
ঢাকা পোস্ট






