কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল জাতিগত সহিংসতা, নির্যাতন, শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। তিনি ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর বিরুদ্ধে সকল অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ২১ বছর আগে অপহৃত কল্পনা চাকমা সম্পর্কে এই মন্তব্য করেন সমাজ গবেষক ও নারী নেত্রীরা।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুণি মিলনায়তনে ‘কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ বছর: তার অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক।
উক্ত আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য ও নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর বলেন, ‘কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর বিরুদ্ধে সকল অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ফলে কল্পনা চাকমা ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু পার্বত্যবিরোধীরা সবসময় এটাকে পুঁজি করে পার্বত্যবাসীদের অধিকার আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন হিসেবে দেখে, কেবলই স্বার্থরক্ষার জন্য। ফলে লংগদুর মতো সহিংস ঘটনার কোনও সুষ্ঠু তদন্তও হয় না।’
ব্লাস্টের পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী নির্যাতনের সহিংসতার মাত্রা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে।’ রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে অনেক ধরনের আইনগত ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘কল্পনা চাকমা শৈশব থেকে পাহাড়র মানুষের নির্যাতন দেখে বড় হয়েছেন। তাই তিনি শাসকবাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। ফলে তাকে ২১ বছর আগেই হারিয়ে যেতে হলো।’ এই ২১ বছরে পাহাড়ের প্রতি রাষ্ট্রের মনোভাব একটুও পাল্টায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘কল্পনা চাকমার অপহরণের ক্ষত পাহাড়ের রাজনৈতিক আন্দোলন ও নারী আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে দীর্ঘদিন চর্চিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী ঘরানার নারী আন্দোলনে কল্পনা চাকমার অপহরণ প্রথম পাহাড়ি ও বাঙালি নারী আন্দোলনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাই আমরা আজও বলি, আমাদের ধমণীতে কল্পনার রক্ত বইছে। কল্পনা চাকমার অপহরণ দেশ বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু গত ২১ বছরেও মামলার তদন্তে কোনও অগ্রগতি হয়নি।’
অন্য বক্তারা বলেন, ‘বছরের পর বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনার শিগগিরই সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমরা এই জোর দাবি জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে ১২ জুন মধ্যরাতে তৎকালীন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ২৩ বছরের কল্পনা চাকমাকে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার নিজ বাড়ি নিউ লাল্যাঘোনা গ্রাম থেকে অপহরণ করা হয়।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।







