নিউজ ডেস্ক:
রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক দূতাবাসকে (ইউএনইচসিআর) অন্তর্ভুক্ত করতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকায় আসন্ন ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন উপলেক্ষ্যে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এ তথ্য জানান।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দুই দিনব্যাপী প্রথমবারের মত ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৫তম সম্মেলন। বিশ্বের ৫৭ দেশের মন্ত্রী ও মন্ত্রী পর্যায়ের অতিথিদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হবে এই সম্মেলন।
ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পাবে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ওআইসি সম্মেলন বাংলাদেশেরে জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে উপায় খোঁজার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে।’
‘কেবল তা-ই নয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে কিছু করার জন্যও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হবে।’
সম্মেলনে অংশ নিতে আসা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪ মে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন নিয়ে যাওয়া হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের মানবিকবোধ উপস্থাপন করা হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘তাড়াহুড়ো না করে পুরো সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে।’
‘মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন অত্যাচার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় দশ লাখ ছাড়িয়েছে। এরইমধ্যে এদের বিশাল অংশের নিবন্ধনের কাজও শেষ করেছে বাংলাদেশ।’
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের কাছে আট হাজার ৩২ রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। এই তালিকা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যাচাইয়ের পরই প্রত্যাবাসন শুরু হবে। তবে কোন তারিখ থেকে ফেরত পাঠানো শুরু হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে শুরু থেকেই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর যুক্ত হতে চাইলেও মিয়ানমার তাদের প্রত্যাখান করে আসছিল।
গত মাসে মিয়ানমারে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সফরের সময়ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত ছিল না মিয়ানমার। জাতিসংঘের ওই প্রতিনিধি দলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকও ছিলেন।
সেসময় মিয়ানমার থেকে ফিরে এসে শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রথম দিকে সপ্তাহে ১৫শ’ করে রোহিঙ্গা নেবে মিয়ানমার। পরে এ সংখ্যা বাড়বে।
মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রসের সাহায্য নিবে তারা তবুও জাতিসংঘের সাহায্য নিবে না দেশটি। প্রয়োজন হলে রোহিঙ্গা প্রর্ত্যাবাসনে সব ব্যয় তারাই বহন করবে।
তবে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার নানা তালবাহানা করছে বলে অভিযোগ করে আসছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধণের ঘটনাকে মিয়ানামেরর পূর্বপরিকল্পিত এবং কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ‘পাঠ্যুস্তকীয় উদাহারণ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো মিয়ানমার অসম্ভব করে তুলেছে। সেখানে (রাখাইন) রোহিঙ্গাদের ফেরত যাবার মতো কোনো নিরাপদ পরিস্থিতিও নেই।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। কিন্তু সে প্রত্যাবাসন এখনও শুরু হয়নি। এই চুক্তির পর রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী জানিয়েছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তারা প্রত্যাবাসন শুরু করবেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে কথিত হামলার ধুয়ো তুলে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নৃশংসতা চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। দেশটির কর্তৃপক্ষ দাবি করে আসছে, রোহিঙ্গা ‘সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। তখন থেকে নির্যাতন নিপীড়ন থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে আনুমানিক ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বর্তমানে তারা কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছে।






